চীনের মহাকাব্যিক অর্থনীতির গল্প - Mati News
Friday, August 7

চীনের মহাকাব্যিক অর্থনীতির গল্প

ফয়সল আবদুল্লাহ

ফয়সল আবদুল্লাহ সিএমজি বাংলা

কীভাবে একটি অনুন্নত দেশ বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হলো? কীভাবে প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করে একটি দেশ গোটা পৃথিবীর অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠল? চলুন শুনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের গল্প। অনুন্নত, উন্নয়নশীল হওয়ার পথে থাকা দেশগুলোর জন্য কোনো না কোনো দিক দিয়ে এই গল্প তো অনুপ্রেরণার উৎস হতেও পারে।

চীনের অর্থনৈতিক বিপ্লব রাতারাতি হয়নি। কিংবা এটি কোনো একগুঁয়ে ছক বা উচ্চভিলাসী পরিকল্পনা অনুসরণ করে গড়ে ওঠেনি। এমনকি, স্রেফ বিশ্বকে দেখানোর জন্য দেশের রাজধানী কিংবা বাছাই করা কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকেই কেবল সমৃদ্ধ করা হয়নি। চীনের অর্থনীতির উন্নয়ন হয়েছে শতভাগ বাস্তবমুখী পরিকল্পনা ও ধাপে ধাপে সংস্কারের হাত ধরে। সেটা হয়েছে গোটা দেশজুড়েই।

সাধারণত আমরা দেখি, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কৌশল হিসেবে অনেক দেশ বছরান্তে একটি বাজেট পাশের সময় বড় বড় তত্ত্ব বা অলীক সব পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু চীন তা করেনি। চীন বিশ্বাস করেছে বাস্তবতায়—যাকে বলা হয় ‘প্র্যাগম্যাটিজম’। এই উত্থানের শুরুটা ১৯৭৮ সালে, সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির মাধ্যমে। ওই সময় থেকে চীনের নেতারা বুঝেছিলেন, অর্থনীতি কোনো নির্দিষ্ট ছকে চলে না। এটি একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। তাই তারা পুরো দেশকে একবারে পরিবর্তন করতে চাননি। প্রথম ধাপে তারা হাত দেন কৃষিখাতে। গ্রাম ও কৃষকদের স্বাবলম্বী করা হয় ওই ধাপে।

দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয় শিল্প খাতের বিস্তার। শাসকরা হঠাৎ করে পুরো দেশে নতুন নীতি চাপিয়ে দেননি। বদলে ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ তৈরি করে ছোট ছোট অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। এর মধ্যে যে মডেলটি সফল হয়েছে সেটাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে সরকার। আর যেগুলো ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে কিংবা সাজানো হয়েছে নতুন করে। অর্থাৎ, একবারে নিখুঁত পরিকল্পনা খোঁজার চেয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী নীতি বদলানোর নমনীয়তাই চীনের প্রথম কৌশল।

অর্থশাস্ত্রের বহুল চর্চিত বিতর্কটা হলো—অর্থনীতি কি শুধু ‘মুক্ত বাজার’ কেন্দ্রিক হওয়া উচিত, নাকি রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত? চীন এই বিতর্ক ভেঙে দিয়েছে। তারা দেখিয়েছে, বাজার এবং সরকার দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক! এবং চাইলে দুটো সিস্টেমের মধ্যেই সামঞ্জস্য করে দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

মুক্ত বাজার অর্থনীতি দেশে প্রতিযোগিতা আনে, ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন আইডিয়া ও উদ্যোগ তৈরিতে উৎসাহিত করে ও দক্ষতা বাড়ায়। এ প্রক্রিয়ায় অন্যসব রাষ্ট্র নিছক দর্শকের ভূমিকায় থাকলেও চীন সরকার এতে বরাবরই সক্রিয়। বাণিজ্যের পথ সুগম করতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎ ও মেগা অবকাঠামো তৈরিতে। সহজ কথায়, একটি শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থা যখন একটি দক্ষ সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়—ফলাফল হয় চীনের মতো অর্থনৈতিক অলৌকিকতা।

আত্মতুষ্টি বা নিজেদের গুটিয়ে রাখা যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চীন ভালো করেই বুঝেছিল যে, বিচ্ছিন্ন থেকে বড় হওয়া যায় না। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করাই ছিল দেশটির তৃতীয় বড় চালিকাশক্তি। বহির্বিশ্বের জন্য নিজেদের দরজা খুলে দেয় চীন। এতে চীনে বৈদেশিক বিনিয়োগের বন্যা বয়ে যায়। বিশ্ব মানের প্রযুক্তি চীনের হাতে আসে এবং রপ্তানি খাত অভূতপূর্ব গতি পায়। চীন হয়ে যায় বিশ্বের প্রধান ‘ম্যানুফ্যাকচারিং পাওয়ারহাউস’ বা উৎপাদন কেন্দ্রে। আজকের দিনে যখন বিশ্ব জুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধ আর প্রতিরক্ষামূলক নীতির আলোচনা চলছে, তখন চীন প্রমাণ করেছে—উন্মুক্ত অর্থনীতিই দ্রুত উন্নয়ন, উচ্চ উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি পথ।

আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন, চীনের তৈরি বুলেট ট্রেন, উন্নত হাইওয়ে আর ঝাঁ চকচকে সব আধুনিক শহরের ছবি। কিন্তু আপনি কি জানেন, চীনের মূল শক্তি শুধু এই বিশাল ইটের দালান বা লোহালক্কড়ের অবকাঠামোতে নয়? চীনের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের দেশের মানুষের মধ্যে!

চীনের চতুর্থ কৌশলটি ছিল অবকাঠামোর পাশাপাশি ‘মানুষের যোগ্যতায়’ ধারাবাহিক বিনিয়োগ। চীন শত শত কোটি ডলার খরচ করেছে তাদের শিক্ষা এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে।

চীন এখন প্রতি বছর ৫০ লাখেরও সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যাথমেটিক্স গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে! এই দক্ষ জনবলই আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং উন্নত উৎপাদনে চীনকে বিশ্বের শীর্ষস্থানে বসিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির বীজ কিন্তু কয়েক দশক আগেই রোপণ করতে হয়—চীন সেটিই সফলভাবে করে দেখিয়েছে।

উন্নয়ন কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না। চীনও আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। যে নীতিগুলো গত চার দশক চীনকে বার্ষিক ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দিয়েছে—যেমন সস্তা শ্রম, দ্রুত নগরায়ণ বা বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ—সেগুলোর কার্যকারিতা বা চাহিদা এখন কমে আসছে। চীনের জনসংখ্যা এখন বয়স্ক হচ্ছে, আবাসন খাতে পুনর্গঠন চলছে, এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিও বেশ জটিল। তাই বলে কি চীনের অর্থনীতি থেমে গেছে? একদম নয়! চীন এখন তার উন্নয়নের ধারা বদলে ফেলছে। এখন চীন সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে গুণগত প্রবৃদ্ধি বা ইংরেজিতে যাকে বলে হাই কোয়ালিটি গ্রোথ-এর দিকে যাচ্ছে।

এখন ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পেছনের না ছুটে, বছরে ৪ থেকে ৫ শতাংশ টেকসই প্রবৃদ্ধিতে নজর দেওয়া হচ্ছে। কারণ এখনকার উন্নয়ন আর সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে উদ্ভাবন, পরিবেশবান্ধব শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর।

সম্প্রতি চীনা নীতিনির্ধারকরা এও স্পষ্টভাবে বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতে হবে মানুষকে কেন্দ্র করে। চীনের গ্রামীণ পর্যটন বা অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে তাকালেই যা পরিষ্কার বোঝা যায়।

আগে হয়তো কোনো গ্রামে শুধু সুন্দর রাস্তাঘাট বানানো বা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলাকেই উন্নয়ন ভাবা হতো। কিন্তু এখন চীনা মডেল বলছে—শুধু গ্রাম সাজালেই হবে না, গ্রামের মানুষদের দক্ষ করে তুলতে হবে। তাদের আয় বাড়াতে হবে।

এ কারণে গ্রামবাসীদের ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, এবং আধুনিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তারা প্রত্যেকে হয়ে উঠছেন উদ্যোক্তা। অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে এক স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি।

এখন প্রশ্ন হলো চীনের এই অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ব কী শিখতে পারে?

প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইতিহাস ও সমাজ ব্যবস্থা আলাদা। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিগুলো সর্বজনীন। একটি রাষ্ট্র সবার আগে যা অনুসরণ করতে পারে তা হলো বাজার ও রাষ্ট্রের যৌথ শক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা এবং অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের দক্ষতা বাড়াতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করা।

অনিশ্চিত এই বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের টিকিয়ে রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হলে বাস্তবকে মেনে প্রতিনিয়ত নতুন শিখতে হবে—চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আমাদের এই শিক্ষাই দেয়।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *