ধ্রুব নীল
শহরের নাম আটকা। আটকা মানে যেটা আটকে আছে। সত্যিই তাই! শহরের সবাই আটকে আছে! নিজেকে নিয়ে। কেউ কারো সাথে কথা তো দূরে থাক, ফিরেও তাকায় না। পাশের বাসায় যে থাকে, তার সঙ্গে চোখাচোখি হলেও চোখ নামিয়ে ফেলে। যেন দেখতেই পায়নি! যেন চোখাচোখি হলেই একটা কিছু ঘটে যাবে। এমন শহরের নাম তো আটকা হবেই।

একদিন আটকা শহর ঘটল অদ্ভুত ঘটনা। একটা দড়ি এসে হাজির। ঠিক দড়ি নয় ওটা। লম্বা লিকলিকে একটা বস্তু। মসৃণ আর রাবারের মতো। টানলে বড় হয় কিন্তু ছোট হয় না।
দড়িটা প্রথমেই গিয়ে পেঁচিয়ে গেল আবদুল মোতালেব সাহেবের কোমরে। মোতালেব সাহেব বাকি সবার মতো। কথাবার্তা বলেন কম। নিজেকে নিয়েই থাকেন। কোমরে দড়ি দেখে শুরু হলো চেঁচামেচি।
‘আজব তো! আমার কোমরে দড়ি আসল কোত্থেকে? কে বাঁধল! খোলে না কেন!’
অনেক টানাটানি করেও কেউ মোতালেব সাহেবের দড়িটা খুলতে পারল না। দড়িটাও দুষ্টু। তিড়িং বিড়িং করে সরে যায়।
তারপর এক দিন দড়িটার আরেক প্রান্ত সোজা চলে গেল পাশের আরেকটা ভবনে। ঢুকে পড়ল শহিদুল হক সাহেবের ফ্ল্যাটে। বেজায় ধনী তিনি। গুরুগম্ভীর চলাফেরা। শহিদুল হকও পড়লেন বিপাকে। যেখানেই যান, কোমরে হতচ্ছাড়া দড়ি। যত দূরেই যান, দড়িও বাড়তে থাকে। কিছুতেই ছিড়ছে না ওটা।
মোতালেব সাহেব তার দড়িটাকে ধরে ধরে ঘর থেকে বের হলেন। দড়ির অপরপ্রান্তে কী আছে সেটা দেখবেন। দেখলেন তাতে শহিদুল সাহেব বাঁধা।
‘ইয়ে আমার দড়িটা দেখি আপনার কোমরে আটকে গেছে।’
‘আরে মশাই! কী আপদ বলুন তো! আটকা শহরে থাকি বলে এভাবে আটকে যাব, এটা তো ভাবিনি। তা আপনার নামটা যেন কী!’
‘আমি মোতালেব, আপনি?’
মোতালেব সাহেব বুঝতে পারলেন দড়িটা কোমরে জড়িয়ে থাকলেও তিনি আসলে আটকে নেই। চলতে ফিরতে সমস্যা হচ্ছে না। আরেকটা বিষয় খেয়াল করলেন, অনেক অনেক দিন পর তিনি বাইরের কারোর সঙ্গে কথা বলছেন।
এরপর দড়ি নিয়ে আরো অনেক কথা হলো দুজনের। দড়িটা কী দিয়ে বানানো? এটা কি রূপকথার দেশ থেকে উড়ে এলো কিনা, দড়িটা কি আর জীবনেও খুলবে না…। একসময় দড়ি থেকে কথা গড়াতে গড়াতে চলে গেল দুজনের দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে। ওরা স্কুলে কী পড়ে না পড়ে এসব হিজিবিজি কথা হলো অনেক।
এই ফাঁকে আজব দড়িটার মধ্যে আরেক ঘটনা ঘটতে শুরু করল। দড়িটার মাঝ বরাবর বের হতে শুরু করল শাখা-প্রশাখা। বলা যায় দড়িটার অনেকগুলো হাত গজাতে শুরু করল। দড়িটা হয়ে যেতে লাগল জালের মতো।
বিনুর ছেলেমেয়েরা সারাদিন মোবাইল ফোন নিয়ে পড়ে থাকে। দড়ির একটা হাত পেঁচিয়ে ধরল তার বড় ছেলে জিতুর কোমর। তারপর একে একে দড়ির হাতে আটকা পড়ল আটকা শহরের হাজার হাজার মানুষ। দড়ির এ মাথা ও মাথা ধরে টানাটানি করতে করতে অনেকের সঙ্গে অনেকের কথা হয়ে গেল। ভার্সিটি পড়ুয়া মিতু তার দড়ির অপরপ্রান্ত কে আছে সেটা দেখতে গিয়ে পেয়ে গেল তার প্রাইমারি স্কুলের বান্ধবী নাদিয়াকে। দুজন সেকি খুশি! দড়ির গল্প বাদ দিয়ে দুজন পুরনো গল্প জুড়ে দিল। মিতু ভুলেই গেল যে সে তার বাসায় ফোনটা ফেলে এসেছে।
ব্যাংকে চাকরি করা জাহিদ তার দড়ির প্রান্ত ধরে ধরে পেয়ে গেল সঞ্জয়, রনি, বাদল নামের অপরিচিত তিনজনকে। তিনজনের সঙ্গে হাবভাব বিনিময় হতে লাগল প্রতিদিন। একজন তার কোমরে জড়ানো দড়ি ধরে টান মারতেই আরেকজন বুঝে নেয় সময় হয়েছে আড্ডা দেওয়ার।
দড়ি হাতড়ে হাতড়ে শহরের অনেক ধরনের মানুষের সঙ্গে অনেক ধরনের মানুষের একটা সম্পর্ক হয়ে গেল। সবাই এখন সবার সঙ্গে কথা বলে। সবাই সবার বাসা চেনে। বাসায় যায়। গল্প করে।
কয়েক মাস পরের কথা। আটকা শহরের মানুষরা এখন আর দড়ি নিয়ে ভাবে না। দড়ি আছে দড়ির মতো। দিনে দিনে বাড়তে বাড়তে ওটা আরো সরু হয়ে গেছে। একেবারে কাপড় সেলাই করার সুতার মতো সরু।
এখন আর আগের মতো কেউ কাউকে দড়ি টেনে সংকেত দেয় না। সবাই সবার সঙ্গে সময়মতো দেখা-সাক্ষাৎ করে, ঘুরতে বের হয়।
একদিন কী হলো! দড়িটা সরু হতে হতে একেবারে গায়েব হয়ে গেল! কেউ কেউ বিষয়টা খেয়াল করল বটে। তবে বিশেষ পাত্তা দিল না। একটা সুতার মতো দড়িকে পাত্তা দেওয়ার কী আছে! সবাই এখন হইচই, আড্ডা, গল্পগুজব আর ঘোরাফেরা নিয়েই ব্যস্ত।




















