কাঠবিড়ালির বন্ধুত্ব - Mati News
Sunday, August 23

কাঠবিড়ালির বন্ধুত্ব

আব্দুস সাত্তার সুমন 

ধামালকোট মাদ্রাসায় পড়ত চৌদ্দ বছরের কিশোর সুমন। পড়াশোনায় সে মোটামুটি ভালো হলেও তার মন ছিল প্রকৃতিপ্রেমী। পাখি, গাছ, ফুল আর ছোট ছোট প্রাণীর প্রতি ছিল তার অদ্ভুত এক টান।

একদিন বিকেলে মাদ্রাসা ছুটি হওয়ার পর সে তার বন্ধু শাহজালালের বাড়িতে বেড়াতে গেল। গল্প করতে করতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল বারান্দার এক কোণে রাখা ছোট্ট একটি খাঁচার দিকে। খাঁচার ভেতরে লেজ নাড়িয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে অদ্ভুত সুন্দর একটি প্রাণী।

a boy and a squirrel

সুমন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,

এটা কী?

শাহজালাল হেসে বলল,

এটা কাঠবিড়ালি। আমার বড় ভাই এনেছে।

সুমন আগে কখনো এত কাছ থেকে কাঠবিড়ালি দেখেনি। প্রাণীটিকে দেখে তার মন ভরে গেল। সে বলল,

এটা কি আমাকে দেবে? আমার খুব ভালো লেগেছে।

শাহজালাল মাথা নেড়ে বলল,

এটা আমার নয়। বড় ভাই এলে তাকে জিজ্ঞেস করো।

পরদিন সকালেই সুমন আবার শাহজালালদের বাড়িতে হাজির হলো। বড় ভাইকে অনেক অনুরোধ করে বলল,

ভাই, কাঠবিড়ালিটা যদি আমাকে দেন!

তিনি বললেন,

এটা আমি ইন্ডিয়া থেকে কিনেছি এনেছে। নিতে হলে এক হাজার টাকা লাগবে।

সুমনের মুখ শুকিয়ে গেল। অনেক অনুরোধ, দর-কষাকষির পর শেষ পর্যন্ত আটশো টাকায় খাঁচাসহ কাঠবিড়ালিটি কিনে নিল সে। নিজের জীবনের জমানো টাকাই ছিল সেই আটশো টাকা।

অপরিসীম আনন্দ নিয়ে সে কাঠবিড়ালিটিকে বাসায় নিয়ে এল। তাদের বাসা ছিল ঢাকা মিরপুরের টিনসেট কলোনিতে।

বাড়িতে ঢুকতেই বাবা খাঁচার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন,

এটা কোথা থেকে এনেছ?

 বাবা যদি বকা দেয়– ভয়ে সুমন বলল,

বন্ধুর ভাই আমাকে গিফট করেছে।

বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন,

টাকা দিয়ে কেনোনি তো?

সুমন মাথা নেড়ে বলল,

না।

বাবা বললেন,

এগুলো আবার কেউ পোষে নাকি? বাংলাদেশেই তো কত কাঠবিড়ালি আছে। এসব নিয়ে সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মন দাও।

কিন্তু বাবার কথা সেদিন সুমনের কানে ঢুকল না। তার সমস্ত ভালোবাসা যেন জড়িয়ে গেল ছোট্ট প্রাণীটির সঙ্গে।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে কাঠবিড়ালিটির কাছে যেত। কখনো পেয়ারা, কখনো কলা, কখনো বাদাম, আবার কখনো নানা ফল এনে খাওয়াত। খাঁচা পরিষ্কার করত, পানি বদলে দিত, আদর করে কথা বলত। ধীরে ধীরে প্রাণীটিও যেন তাকে চিনে ফেলল। সুমন কাছে গেলেই লেজ নেড়ে খুশি হতো, খাঁচার ভেতরে লাফিয়ে বেড়াত।

মাদ্রাসায় ক্লাস করলেও তার মন পড়ে থাকত বাসায়। কখন ফিরে গিয়ে তার ছোট্ট বন্ধুটিকে দেখবে এই ভাবনাই সারাক্ষণ তাকে তাড়িয়ে বেড়াত।

এ নিয়ে বাবার রাগও কম ছিল না।

তিনি বলতেন,

পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাক্ষণ কাঠবিড়ালির পেছনে ঘুরছ! মানুষ হতে হলে বইয়ের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করতে হয়।

সুমন চুপ করে থাকত। কারণ সে জানত, এই ছোট্ট প্রাণীটিও তার জীবনের এক মূল্যবান বন্ধু হয়ে উঠেছে।

কিন্তু সুখের দিন বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

একদিন মাদ্রাসায় থাকা অবস্থায় খবর এল, তার প্রিয় কাঠবিড়ালিটি আর বেঁচে নেই। খবর শুনে সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। ছুটে এসে খাঁচার সামনে বসে রইল। ছোট্ট প্রাণীটি নিশ্চুপ হয়ে পড়ে আছে।

সেদিন সুমনের চোখের জল থামছিল না। মনে হচ্ছিল, সে যেন তার এক আপন বন্ধুকেই হারিয়ে ফেলেছে।

কয়েক দিন পরে সে জানতে পারল আরও একটি সত্য। যে কথা শুনে তার মন আরও ভেঙে গেল।

শাহজালালের বড় ভাই বলেছিলেন, কাঠবিড়ালিটি নাকি ভারত থেকে আনা। পরে সুমন জানতে পারল, কথাটি সত্য ছিল না। কাঠবিড়ালিটি আসলে বাংলাদেশ থেকেই ধরে আনা হয়েছিল। বিদেশি প্রাণী বলে বেশি দাম নেওয়ার জন্যই মিথ্যা গল্প বানানো হয়েছিল।

মিথ্যা কথা বলে সাময়িক লাভ করা যায়, কিন্তু সত্য একদিন না একদিন প্রকাশ পেয়েই যায়।

সময় গড়িয়ে গেল। ছোট্ট সুমন একদিন বড় হয়ে উঠল। জীবনের ব্যস্ততায় অনেক স্মৃতি ফিকে হয়ে গেল, কিন্তু একটি স্মৃতি কখনো মুছে গেল না।

আজও যখন কোনো গাছের ডালে ছুটে বেড়ানো কাঠবিড়ালি তার চোখে পড়ে, তখন অজান্তেই তার মনে ভেসে ওঠে সেই ছোট্ট খাঁচা, সেই পেয়ারা-কলা খাওয়ানোর দিনগুলো, আর সেই নীরব বিদায়ের মুহূর্ত।

সে তখন মনে মনে বলে,

ভালোবাসা কখনো প্রাণীর আকার দেখে জন্মায় না; জন্মায় মমতা থেকে। আর সত্যিকারের বন্ধুত্বের স্মৃতি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না, বরং জীবনের প্রতিটি ঋতুতে হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *