নারীদের স্বাস্থ্য সচেতন ও দক্ষতা উন্নয়নের আয়োজনে গ্রীন ভয়েসের অঙ্গসংগঠন বহ্নিশিখা - Mati News
Sunday, August 23

নারীদের স্বাস্থ্য সচেতন ও দক্ষতা উন্নয়নের আয়োজনে গ্রীন ভয়েসের অঙ্গসংগঠন বহ্নিশিখা

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  “ইডেন মহিলা কলেজ”। যুগ যুগ ধরে নারী শিক্ষার এক প্রজ্জ্বলিত প্রদ্বীপ জাগরণের ভূমিকা পালন করে এই কলেজ। যেখানে নারীদের কেবলমাত্র শিক্ষা-কার্যক্রম পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখা হয় না বরং তাদের সফল জীবনযাপনের জন্য যাবতীয় সকল বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে তাদেরকে দক্ষ করে তোলা হয়। তেমনই এক কর্মশালার আয়োজন নিয়ে আসে গ্রীন ভয়েসের অঙ্গ সংগঠন বহ্নিশিখা। বহ্নিশিখা নারীদের সুস্বাস্থ্য ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্য আয়োজন করেন ” পরসেবায় নারী “। যেখানে নারীদের আরও দক্ষ, উন্নত ও আলোকিত নারীতে রূপান্তরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল “প্রজনন স্বাস্থ্য ও জীবন দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক কর্মশালা”। যেখানে নারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, মাসিক স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইডেন মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর শাহানাজ পারভীন, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মো. শাহজাহান শেখ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) উপ-পরিচালক (প্রশাসন-১) জনাব শামীম আল মামুন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্রীন ভয়েস ও বহ্নিশিখার প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক জনাব আলমগীর কবির। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ও আজগর আলী হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ড. ঈশিতা বিশ্বাস। উপস্থিত ছিলেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক উপদেষ্টা ড. শারমিন জাহান ও প্রফেসর রিতা হালদার, গ্রীন ভয়েস রাজশাহী বিভাগের সহ-সমন্বয়ক ফাহামিদা নাজনীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহ্নিশিখা শাখার সভাপতি বৈশাখি মুখার্জি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিনিধি হোমায়রা খাতুন, ড. সারা বানু সুচি ও ঝর্না আক্তার। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গ্রীন ভয়েস ইডেন শাখার সভাপতি নুসরাত ইমরোজ তিষা এবং বহ্নিশিখা ইডেন কলেজ শাখার সভাপতি প্রতিভা মোস্তফা প্রাপ্তি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে উদ্ভোধনী বক্তব্য প্রদান করেন ইডেন মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর শাহানাজ পারভীন। তিনি উপস্থিত সকলকে অভ্যর্থনা জানিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেন। নারী শিক্ষার্থীদের মনোবল বৃদ্ধি করতে তিনি প্রথমেই বলেন- আমরা নারী, আমরা সব পারি। একজন মা যেমন পরিবারের একটি স্তম্ভ, তেমনই একজন নারী একটি সমাজের খুটি। ভবিষ্যতে নারীরা সমাজের আরও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। বহ্নিশিখার যাত্রা শুভ হোক এই কামনা করে তিনি অনুষ্ঠানের শুভ উদ্ভোধন ঘোষণা করেন।

এ পর্যায়ে বক্তব্য প্রদান করেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মো. শাহজাহান শেখ। তিনি বলেন, শৌচাগারে স্যানিটাইজেশনের খুবই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। তিনি ইডেন মহিলা কলেজে বিদ্যমান সকল শৌচাগার আরও উন্নত ও ব্যবহারবান্ধব করে তোলার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে বক্তব্য রাখেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) উপ-পরিচালক (প্রশাসন-১) জনাব শামীম আল মামুন। তিনি উপস্থিত সকলকের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন স্যানিটাইজেশনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রজনন ব্যবস্থা। তাই সেটি উন্নত করা খুবই প্রয়োজন। তিনি স্যানিটাইজেশন দ্রুত উন্নত করার জন্য অনুরোধ করে তার মূল্যবান বক্তব্য শেষ করেন।

পরবর্তীতে বক্তব্য প্রদান করেন গ্রীন ভয়েস ও বহ্নিশিখার প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক জনাব আলমগীর কবির। তিনি বলেন গ্রীন ভয়েসের নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক অঙ্গসংগঠন হচ্ছে বহ্নিশিখা। এটি সারাদেশে মেয়েদেরকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, জ্ঞানগত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বহ্নিশিখার নারীদের সেলাই, কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য প্রযুক্তিতেও দক্ষ করে তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে। বহ্নিশিখা এই অঙ্গসংগঠনটি ঢাকা, কুমিল্লা, নওগা, গাইবান্ধা, খুলনাসহ দেশের প্রায় ৩৩ টা জেলায় আত্মরক্ষা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করেছে। এছাড়াও বৃক্ষরপোণ, শরৎ উৎসব, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন,  আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণসহ আরও নানান ধরনের  কর্মশালার আয়োজন করে থাকে বহ্নিশিখা। এই কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পুরুষ্কার অর্জনে সক্ষম হয়েছে এই অঙ্গ সংগঠনটি। তিনি নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনের প্রতি লক্ষ্য রেখে আরও বলেন – নারীদের পরিবেশ বান্ধব শৌচাগার না হওয়ার কারণে অধিকাংশ নারীরাই আজ জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। শৌচাগারের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রতি জোর দিয়ে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতার লাইন বলেন -“আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে? তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!”।

তাই বাংলাদেশে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তা অতীব জরুরী। গ্রীন ভয়েসের বহ্নিশিখা নারীদের দক্ষ করে তুলতে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে।

অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের,

আয়রিন সুলতানা পরিবেশন করেন একটি চমৎকার গান , “এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন”। পরিবর্তীতে মঞ্চ মাতাতে “থাক থাক নিজ মনে দূরেতে” সংগীত পরিবেশন করেন হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের, ঈশিতা মীম।

অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে প্রধান আলোচক ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ও আজগর আলী হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ড. ঈশিতা বিশ্বাস মূল বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন – এক ঝাক সম্ভবনাময়ী তরুণীদের কাছে এসে আমি আজ বেশ ভালোই আছি। তিনি সুস্থতার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে প্রথমেই বলেন – আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু মস্তিষ্ক আর হৃদপিণ্ড নয়। সমস্ত শরীরই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন সুস্থ নারীর মাধ্যমেই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে উঠা সম্ভব। তিনি পরিষ্কার স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার , ৪-৬ ঘন্টা পর পর পরিবর্তন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন, পানি পান করা ও সুষম খাবার গ্রহণের প্রতি দিকনির্দেশনা দেন। তিনি আরও বলেন – বর্তমানে বাংলাদেশের মাত্র ২৭% মেয়েরা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে। এই বিষয়টি সমাধান করা অত্যন্ত জরুরী। এর মাধ্যমেই প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ অনেকাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি বলেন- বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সার্ভিকাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের একটি নীরব ঘাতক। তবে সার্ভিকাল ক্যান্সার ৯৫% প্রতিরোধ করা সম্ভব টিকা প্রদানের মাধ্যমে। মেয়েদের আরেকটি অন্যতম সমস্যা হলো স্তন ক্যান্সার। এর থেকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। তিনি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, একটা মানুষ তখনই মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে যখন সে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকবে। যে ব্যক্তি মানসিকভাবে যত শক্তিশালী সে তত বেশি সুস্থ। সেজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা, নিজেকে ভালোবাসা। তিনি বলেন আমাদের উচিত  স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণ করা, রাত জাগা থেকে বিরত থাকা এবং আমাদের পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়ামের  প্রয়োজন। যা আমাদের শরীর মন দুটোই ভালো রাখে এবং আমাদেরকে রাখে প্রাণবন্ত।

এই পর্যায়ে শুরু হয় প্রশ্ন-উত্তর পর্ব। সমাজবিজ্ঞান  বিভাগের মাহবুবা আক্তার প্রশ্ন করেন মাসিক সাইকেল বিঘ্ন ঘটা কি সমস্যাযুক্ত? মনোবিজ্ঞান বিভাগের মিথিলা ঘোষ জানতে যান, ওজন বৃদ্ধির সাথে মাসিক অনিয়মিত হয় কীনা? মনোবিজ্ঞান বিভাগের তাপসী হলে থাকার ফলে ব্যালেন্স ডায়েটের মেইনটেইন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে আলোচক সকলের যথাযথ উত্তর প্রদানের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাসের উন্নতি করেন। আর এভাবেই প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শেষ হয়।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়  “Yoga for Women” শীর্ষক বিষয়ক একটি বিশেষ সেশন দিয়ে। উক্ত সেশনটি তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহ্নিশিখা শাখার সভাপতি বৈশাখি মুখার্জি। যেখানে তিনি নিয়মিত যোগব্যায়ামের মাধ্যমে নারীদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মানসিক প্রশান্তি, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থ জীবনধারা গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

বহ্নিশিখা ইডেন কলেজ শাখার সভাপতি প্রতিভা মোস্তফা প্রাপ্তি সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন- আশাকরি আজকের আলোচনার মাধ্যমে আমরা প্রজনন স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, কৈশোরকালিন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন এবং জীবন দক্ষতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নতুন জ্ঞান অর্জন করেছি। এই জ্ঞান শুধু নিজের জীবনেই নয়, পরিবার ও সমাজও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে। এই বলে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

অনুষ্ঠানের অন্তিম পর্যায়ে এসে অংশগ্রহণকারীদের জন্য সৌজন্য হিসেবে দেওয়া হয় স্যানিটারি প্যাড, কলম ও খাবার।

প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতাই বদলে দিতে পারে একজন নারীর জীবন, একটি জীবনে গল্প, একটি উন্নত সমাজের চিত্র। তাই সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন সুস্থ পরিবেশ। আর এই সুস্থ পরিবেশ গঠনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নারীরা। তাই নারীদের উন্নত ও নিরাপদ জীবন গড়তে হতে হবে আমাদের সচেতন ও সোচ্চার।

লেখক পরিচিতি:-

নাম:-জান্নাতুল মাওয়া (রিফাত)

ডিপার্টমেন্ট:-ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং 

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *