বৃষ্টি, ফুটবল আর বন্ধুত্বের এক স্মরণীয় দিন - Mati News
Sunday, August 23

বৃষ্টি, ফুটবল আর বন্ধুত্বের এক স্মরণীয় দিন

কিছু দিন থাকে, যেগুলো পরিকল্পনা করে সুন্দর হয় না, বরং হঠাৎ নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তই দিনটিকে আজীবনের স্মৃতিতে পরিণত করে। আমাদের কাছে শ্রীরামপুর কাঠের ব্রিজে কাটানো দিনটিও ছিল ঠিক তেমনই— যেখানে ছিল বৃষ্টিভেজা ফুটবল, বন্ধুত্বের উচ্ছ্বাস, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর একঝাঁক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

দিনটির শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিকল্পনা নিয়ে। বরিশাল বিভাগীয় ছাত্র কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। নির্ধারিত সময়ে আমরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল মাঠে উপস্থিত হই। আকাশ তখন মেঘলা, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, চারদিকে বইছে শীতল মৃদু বাতাস। এমন আবহাওয়ায় সাধারণত মানুষ ঘরে থাকতে চায়, কিন্তু আমাদের কাছে সেটিই যেন ছিল খেলার সবচেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ।

বৃষ্টির মধ্যে খেলা শুরু হলো। মাঠ কাদায় ভরে গেলেও আমাদের উদ্যমে কোনো ভাটা পড়েনি। একে একে সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। আমরা যেন ফিরে গিয়েছিলাম শৈশবের সেই দিনগুলোতে, যখন সময়ের হিসাব ছিল না, ক্লান্তি বলে কিছু ছিল না। মনে হচ্ছিল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেললেও যেন শরীরে কোনো অবসাদ আসবে না। খেলতে খেলতেই কখন দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেল, তা টেরই পাইনি।

এমন সময় বড় ভাইদের একজন আমাদের সতর্ক করে বললেন, “আর নয়, এবার খেলা শেষ করো। এতক্ষণ বৃষ্টিতে খেললে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়বে।” বড় ভাইয়ের কথা অমান্য করার সুযোগ ছিল না। তাই মন না চাইলেও খেলা শেষ করলাম। ততক্ষণে আমাদের জামাকাপড় কাদা-মাটিতে একাকার। শরীরজুড়ে কাদা, বৃষ্টির পানি আর ক্লান্তির মিশেল।

ঠিক তখনই আমাদের মধ্যে একজন হঠাৎ প্রস্তাব দিল, “চলুন ভাই, এই অবস্থাতেই শ্রীরামপুর কাঠের ব্রিজে যাই। সেখানে ঘুরব, গোসলও করে আসব।” প্রস্তাবটি শুনে কারও আর দ্বিমত রইল না। মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। ক্যাম্পাস থেকে একটি ভ্যান ভাড়া করে আমরা রওনা দিলাম শ্রীরামপুর কাঠের ব্রিজের উদ্দেশে।

দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় থাকার কারণে আমাদের সবারই মনে একটা আশঙ্কা কাজ করছিল— আজ হয়তো জ্বর নিশ্চিত। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল একসঙ্গে কাটানো সময়ের আনন্দ। হাসি-আড্ডা আর গল্পে গল্পে কখন যে পথ শেষ হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি।

শ্রীরামপুর কাঠের ব্রিজে পৌঁছে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি চমক। গোসল করার উদ্দেশ্যে গেলেও সেখানে চোখে পড়ল দারুণ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও সাজানো-গোছানো একটি ফুটবল মাঠ। মাঠটি দেখেই যেন আমাদের ভেতরের ছোট্ট শিশুটি আবার জেগে উঠল। কেউ একজন বলে উঠল, “চলুন ভাই, আরেকটু ফুটবল খেলি। তারপর না হয় গোসল করব।”

ব্যস, আবার শুরু হলো খেলা। প্রায় বিশ মিনিট ধরে আমরা প্রাণ খুলে ফুটবল খেললাম। কাদা, বৃষ্টি আর হাসির শব্দে পুরো মাঠ মুখর হয়ে উঠেছিল। খেলা শেষে সবাই মিলে গোসল করলাম। ঠান্ডা পানিতে গোসল করে যেন সারাদিনের ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল।

গোসল শেষে শুরু হলো আরেক পর্ব— স্মৃতি বন্দি করার আয়োজন। এত সুন্দর একটি দিন শুধু মনে রাখলেই তো হবে না, ছবির ফ্রেমেও ধরে রাখতে হবে। তাই সবাই মিলে গ্রুপ ফটো তুললাম। প্রতিটি ছবিতে ছিল নির্মল হাসি, বন্ধুত্বের আন্তরিকতা আর একসঙ্গে কাটানো অসাধারণ মুহূর্তের গল্প।

এরপর আমরা ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, নদীর শান্ত জল, কাঠের ব্রিজের নান্দনিক সৌন্দর্য আর বৃষ্টিভেজা পরিবেশ যেন আমাদের আরও কিছুক্ষণ সেখানে আটকে রাখতে চাইছিল। প্রকৃতির সেই অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পর আবার ফিরে এলাম আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে।

সেদিন আমরা সবাই ভিজেছিলাম। অনেকেই বলছিল, “আজ মনে হয় সবারই জ্বর হবে।” হয়তো সত্যিই অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু কিছু স্মৃতি এমন হয়, যার আনন্দের কাছে সামান্য কষ্টও তুচ্ছ হয়ে যায়। বন্ধুত্বের টান, একসঙ্গে কাটানো সময় আর হঠাৎ নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত আমাদের উপহার দিয়েছে এমন একটি দিন, যা বহু বছর পরও মনে পড়লে মুখে হাসি ফুটবে।

জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে এমন কিছু মুহূর্তই মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দেয়— সুখ মানে সব সময় বড় কিছু নয়, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কাটানো একটি বৃষ্টিভেজা বিকেলও হতে পারে আজীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।

লেখক 

মোঃ হাবিবুল্লাহ 

শিক্ষার্থী,আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

সহযোগী সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *