বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি দীর্ঘ সময় ধরে এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে। তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে যান। যদিও কোস্টগার্ড শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। নিখোঁজের পর থেকে পরিবার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা, সংবাদ সম্মেলন এবং বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও কোনো সুরাহা পায়নি। এমনকি তাঁর বাবা উচ্চ আদালতেও শরণাপন্ন হয়েছেন। গত ১২ জুলাই হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজকে খুঁজে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তবে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা গুমের অভিযোগের তদন্ত নিয়ে পুরনো প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। ২৫ আগস্ট সচিবালয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আবাসিক প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠককালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। তবে অতীতের ঘটনাগুলোর তদন্ত ও নতুন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ ঘিরে জনমনে উদ্বেগ ও প্রশ্ন রয়েই গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ অনুযায়ী, গুমের অভিযোগের তদন্তের নিয়ন্ত্রণ ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে। কমিশন কারাগার, হাজতখানা ও যেকোনো আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা রাখত। কিন্তু নতুন বিলে সেই কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন গুমের অভিযোগের ফৌজদারি তদন্তের নিয়ন্ত্রণ আর মানবাধিকার কমিশনের হাতে নেই। যদিও নতুন বিলে একটি ইতিবাচক দিক যুক্ত হয়েছে—কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযুক্ত বাহিনীকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দিলেও, তদন্তকারী সংস্থাটি রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোর মধ্যেই থাকছে। কে তদন্ত করবে তা নির্ধারণের ক্ষমতাও সরকারের হাতেই থাকছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এছাড়া ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুমের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের তত্ত্বাবধান মানবাধিকার কমিশনের হাতে থাকলেও, নতুন বিলে তা সরকারের অধীনে রাখা হয়েছে।
গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, কোন বাহিনী গুমের সঙ্গে জড়িত, তা ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে শুরুতে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থা হলো একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করা, যার নিয়ন্ত্রণ পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর হাতে থাকবে না।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুমের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে সামনে আসতে থাকে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ১০টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয় এবং ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় আরও বেশি। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১ হাজার ২৮২ জন দীর্ঘ সময় গোপন আটকের পর ফিরে এলেও ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। বাস্তবে গুমের সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে র্যাব, পুলিশ, ডিবি এবং সিটিটিসির মতো বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক সংস্থা যৌথভাবে কাজ করেছে, যা তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে। কমিশনের দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে মাত্র ২৫০টির মতো ঘটনার নথিগত প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ এই বিষয়ে দায়বদ্ধতা স্বীকার করেছে। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের কারিগরি প্রতিনিধিদল ২০২৫ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সফর করে। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গুম হওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত চালানো ভিন্ন বিষয়। গুমের খবর পাওয়া মাত্রই কোনো আনুষ্ঠানিক মামলার অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।
নতুন বিলে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সাধারণ গুমের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া গোপন আটককেন্দ্র পরিচালনা বা সহায়তা করাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই বিলের খসড়া প্রকাশের পর মতামতের জন্য মাত্র এক দিন সময় রাখাকে ‘প্রহসনমূলক’ বলে সমালোচনা করেছে।
আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবার আগে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ’। একই দিনে গুম থেকে প্রত্যেক মানুষের সুরক্ষা-সম্পর্কিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন আইন ও তদন্ত প্রক্রিয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে পারে কি না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোথাও গোপন আটককেন্দ্র বা বন্দিশালা আছে সন্দেহ হলে কমিশন সেখানে যেতে পারত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গুম করে কীভাবে রাখা হয়েছিল, নিজের বয়ানে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওই বছরের ২৫ জুন বিএনপি নেতা ও ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী আলম নিখোঁজ হলে রাজনৈতিক গুমের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৩-১৪ সালের দিকে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২২ দিন পর, ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কমিশনের দায়িত্ব ছিল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুমের অভিযোগ অনুসন্ধান করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনায় নেয়।




















