বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের সম্পদ আহরণ ও পর্যটন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। এই তিন মাস জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি বা পর্যটকদের জন্য বনের দুয়ার বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সুন্দরবনে মানুষের অবৈধ প্রবেশ পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। মাছ ও কাঁকড়া শিকারের উদ্দেশ্যে নিয়মিত বিরতিতে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ছে অসাধু চক্র, যার ফলে একের পর এক আটকের ঘটনা ঘটছে।
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনে প্রবেশ ও সম্পদ আহরণের দায়ে ৩৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ৪৪ জনকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অভিযানের সময় অবৈধ কাজে ব্যবহৃত ৩৮টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ঝিনুক পাচারের একটি ঘটনায় একটি পিকআপসহ প্রায় ৭৭ বস্তা ঝিনুক উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে ২৭৯ কেজি কাঁকড়া জব্দ করে পরে সেগুলো অবমুক্ত করা হয়েছে।
বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন জানান, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়ি থেকে ২৪ ঘণ্টা নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে বিশাল সুন্দরবনের অসংখ্য খাল ও প্রবেশপথের কারণে সব এলাকায় একই সময়ে নজরদারি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। একদিকে টহল চললে সুযোগ বুঝে অন্যদিক দিয়ে লোকজন বনে ঢুকে পড়ছে। এছাড়া বন বিভাগের জনবল সংকটও একটি বড় সমস্যা, যা নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, ১৮ আগস্ট পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কোকিলমনি এলাকার তিন কোনা আইল্যান্ড থেকে কাঁকড়া শিকারের সময় আট জেলেকে আটক করা হয়। এর আগের দিন পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে অবৈধভাবে প্রবেশ করে মাছ শিকারের অভিযোগে আরও তিন জেলেকে আটক করা হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে একটি ডিঙি নৌকা, আড়াই মণ মাছ এবং দুটি জাল জব্দ করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে ও বনজীবীদের জীবিকায় টান পড়েছে। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার জেলে রাকিবুল ইসলাম জানান, অভাবের তাড়নায় অনেক জেলে ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করেন। তবে সব জেলে এমনটি করেন না; কিছু অসাধু ব্যক্তি অধিক মুনাফার লোভে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, যার দায় সাধারণ জেলেদের ওপরও পড়ে। গাবুরা ইউনিয়নের জেলে মিজানুর রহমান ও আতিকুর রহমানের মতে, বন বন্ধ থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, তবে বনে গেলে জলদস্যুদের আতঙ্কে থাকতে হয়।
স্থানীয় জেলেদের একাংশের অভিযোগ, বনের ভেতরে মানুষের চলাচল কম থাকায় এই সুযোগে দস্যু ও অপরাধীরা বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং হরিণ ও বাঘের মতো বন্যপ্রাণী নিধনের মতো অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। এরফান উদ্দিন অবশ্য দাবি করেন, সুন্দরবনের জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। তিনি জেলে ও বনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান, কোনো তথ্য থাকলে তা যেন দ্রুত বন বিভাগকে জানানো হয়, কারণ তথ্যের অভাবে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সুন্দরবন রক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রজনন মৌসুমে মাছ, কাঁকড়া ও বন্যপ্রাণীর বংশবিস্তারে সহায়তা করা। কিন্তু ৩৮টি মামলা ও ৪৪ জন আটকের ঘটনা প্রমাণ করে যে, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। বন বিভাগ মনে করছে, কেবল আটকের সংখ্যা বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নজরদারি, পর্যাপ্ত জনবল, নিয়মিত টহল এবং জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধের পাশাপাশি অবৈধ শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয়দের জীবিকার বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে। বন বিভাগ যখন জানে যে টহল থাকা সত্ত্বেও মানুষ বনে ঢুকছে, তখন কৌশল পরিবর্তন করে প্রবেশপথগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায়, নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান চললেও সুন্দরবনে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— যে বনে ২৪ ঘণ্টা টহল চলছে, সেখানে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মানুষ ঢুকছে কীভাবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ৪৪ জন আটকের যে সামগ্রিক চিত্র বন বিভাগের তথ্য থেকে পাওয়া যাচ্ছে, তার পরও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরিবারের অভাব-অনটনের সময় অনেকের পক্ষেই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছেলে-মেয়ে নিয়ে কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে— সুন্দরবনে প্রবেশের পথগুলো কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।














