মানুষ যখন প্রথম বুঝতে শেখে যে আগুন শুধু পোড়ায় না, উষ্ণতাও দেয়—তখনই চীনের প্রাচীন চিকিৎসার খাতায় লেখা হতে থাকে এক নতুন অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের নাম মক্সিবাশ্চন। ধোঁয়ায় ভরা এক প্রাচীন কক্ষ, শুকনো ভেষজের গন্ধ, আর শরীরের নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিয়ন্ত্রিত উষ্ণতার স্পর্শ—এসবের সম্মিলনে জন্ম নেয় এমন এক চিকিৎসাপদ্ধতি, যা হাজার বছরের পথ পেরিয়ে আজও টিকে আছে। চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাবিজ্ঞান বা টিসিএম-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ মক্সিবাশ্চন শুধু একটি থেরাপি নয়; এটি শরীর, প্রকৃতি ও সময়ের মধ্যে ভারসাম্য ফেরানোর এক দর্শন।

মক্সিবাশ্চনকে চীনা ভাষায় বলে চিউ। এই ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাপদ্ধতিতে ভেষজ উদ্ভিদ পুড়িয়ে শরীরের নির্দিষ্ট আকুপাংচার পয়েন্টে উষ্ণতা প্রয়োগ করা হয়। এ পদ্ধতিতে শুকনো পাতা জ্বালিয়ে শরীরের নির্দিষ্ট আকুপাংচার পয়েন্টে উত্তাপ দেওয়া হয়। এতে শরীরের শক্তির প্রবাহ ভালো হয় এবং আরাম পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে সাধারণত মক্সা স্টিক ত্বকের কাছাকাছি ধরে রাখা হয়, বা কোনো সুরক্ষামূলক স্তরের ওপর রাখা হয়। কখনো কখনো এটি আকুপাংচার সূঁচের সঙ্গেও ব্যবহার করা হয়।
এ কাজে পোড়ানো হয় মাগওয়ার্ট, এটি হলো নানা ধরনের ঔষধি গুণসম্পন্ন সুগন্ধীযুক্ত ফুল। শুকনো মাগওয়ার্ট বহুদিন সংরক্ষণ করে গুঁড়ো করে তুলোর বলের মতো বানানো হয়। এটাকে বলা হয় মোক্সা। এই মোক্সা কখনো সরাসরি, কখনো সূঁচের সঙ্গে, আবার কখনো কাঠিতে পুরে ব্যবহার করা হয়।
চীনা লেখার প্রাচীনতম রূপ, ওরাকল বোন স্ক্রিপ্ট-এর গবেষণায় দেখা গেছে খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০-১০৪৬ সময়কালে ইয়িন রাজবংশেও প্রয়োগ করা হয়েছিল আকুপাংচারের চেয়েও পুরনো এ চিকিৎসা পদ্ধতি। প্রাচীন চীনের বাঁশের স্লিপ এবং সিল্ক দিয়ে তৈরি বইয়ের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে ছিন ও হান রাজবংশের আগে মক্সিবাশ্চনের বিকাশ ঘটেছিল।
এর অনেক অনেক পর ১৬শ শতকের জাপানে কর্মরত পর্তুগিজ মিশনারিদের লেখায়ও চীনা মক্সিবাশ্চনের কথা পাওয়া যায়। পর্তুগীজরা একে বলত ‘আগুনের বোতাম।’
চীনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের শরীরে ছি নামের এক প্রাণশক্তি নির্দিষ্ট পথ ধরে প্রবাহিত হয়। ঠান্ডা, আর্দ্রতা বা দুর্বলতার কারণে এই প্রবাহ ব্যাহত হলে রোগ জন্ম নেয়। মক্সিবাশ্চনের মূল লক্ষ্য হলো—শরীরের ওই ঠান্ডা দূর করা, রক্ত ও ছি-এর প্রবাহ মসৃণ রাখা এবং ইয়াং শক্তির ঘাটতি পূরণ করা। বিশেষ করে যেসব রোগকে চীনা চিকিৎসায় ‘ডিফিসিয়েন্ট কন্ডিশন’ বা দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা হিসেবে ধরা হয়, সেখানে মক্সিবাশ্চনকে অত্যন্ত কার্যকর মনে করা হয়।
খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক প্রাচীন চীনা চিকিৎসক বিয়ান চুয়ে তার লেখায় আকুপাংচারের চেয়েও মক্সিবাশ্চনের গুরুত্ব বেশি বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, মোক্সা শরীরে নতুন শক্তি যোগ করতে পারে—যা শুধু সূঁচ দিয়ে সম্ভব নয়।
মক্সিবাশ্চন বা চিউর তিনটি পদ্ধতি প্রচলিত আছে। প্রথমটি হলো সরাসরি মক্সিবাশ্চন। শরীরের নির্দিষ্ট পয়েন্টে ছোট মোক্সা রেখে তা সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়, এতে অবশ্য ফোসকা পড়ে এবং দাগও হয়। এখন এই পদ্ধতি খুব একটা ব্যবহৃত হয় না।
নন-স্কারিং মেথডটি হলো মোক্সা জ্বালানো হলেও ফোসকা পড়ার আগেই তা সরিয়ে ফেলা হয়। আর এখনকার সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো পরোক্ষ মোক্সা। এখানে—মোক্সা কাঠি ত্বকের কাছে ধরে গরম করা হয়, কিংবা আকুপাংচার সূঁচের মাথায় মোক্সা জ্বালিয়ে সূঁচ গরম করা হয়।
ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিন বা টিসিএম-এ মক্সিবাশ্চনের ব্যবহার রয়েছে বিশেষ কিছু রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে। এ তালিকায় আছে দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, হজমের সমস্যা, স্ট্রোক পরবর্তী জটিলতা, আলসারেটিভ কোলাইটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য ও উচ্চ রক্তচাপ।
মক্সিবাশ্চনের আরেক জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত ধারা হলো সানফু মক্সিবাশ্চন। চীনের নামকরা টিসিএম হাসপাতালগুলোতে এটি চালু আছে। বিশেষ করে শীতকালের রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয় এটি। সাধারণত হারবাল প্যাচ দিয়ে আকুপাংচার পয়েন্টে প্রয়োগ করা হয় এই মক্সিবাশ্চন।
বেইজিং হসপিটাল অফ ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিনের সভাপতি লিউ ছিংছুয়ান বলেন, সানফু মক্সিবাশ্চন মিং রাজবংশের একটি টিসিএম সূত্র থেকে এসেছে। এতে মূলত সাদা সরিষা বীজ এবং শুকনো আদা ব্যবহার করা হয়। তার মতে, এই থেরাপি হাঁপানির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হত এবং ত্বকের আকুপাংচার পয়েন্টগুলোয় কিছু চিহ্ন রেখে দেয়। তবে আধুনিক সানফু মক্সিবাশ্চনে দাগ কম হয় এবং উদ্দীপক আকুপাংচার পয়েন্টগুলোয় শক্তিশালী প্রভাব পড়ে।
প্রাচীন চীনের মাওয়াংতুই সমাধি, হানতানপো সমাধি এবং অন্যান্য প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া বাঁশ ও সিল্কের নথিপত্রে দেখা গেছে, প্রাচীন চীনে মক্সিবাশ্চনের নানা শ্রেণিবিভাগ ছিল এবং অনেক ধরনের রোগের চিকিৎসায় কাজে লাগত। এ ছাড়া, মক্সিবাশ্চন কখন ব্যবহার করা উচিত, কখন ব্যবহার করা উচিত নয় এবং এর আগে পরে কিভাবে যত্ন নেওয়া উচিত—এই বিষয়গুলিও নথিভুক্ত ছিল। গবেষণার ভিত্তিতে ধারণা করা হয়েছে, মক্সিবাশ্চনের এই ব্যবহারের ফলেই শরীরের মেরিডিয়ান বা শক্তি প্রবাহের নানা পথ আবিষ্কৃত হয়েছে।
চীনে আকুপাংচার ও মক্সিবাশ্চন বিষয়ে রয়েছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা। দেশটিতে ৪৬টি তৃতীয় স্তরের চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যাদের বেশিরভাগেই আকুপাংচার ও মক্সিবাশ্চন বিভাগ আছে। এর পাশাপাশি ১০টি পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৬টি নন-মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এই বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছে।
এখন টিসিএম এর গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে মক্সিবাশ্চন নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কোর্সটি হলো ৫ বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রি, এরপর ৩ বছরের মাস্টার্স, এবং আরও ৩ বছরের পিএইচডি। অথবা করা যায় ৭ বছরের সমন্বিত মাস্টার্স প্রোগ্রাম।
২০০২ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে চীনে আকুপাংচার ও মক্সিবাশ্চন বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—চীনে আছে ২০ লাখের বেশি মক্সিবাশ্চন প্রতিষ্ঠান। এই মক্সিবাশ্চনকে ঘিরে আছে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান। এর ব্যবহারকারী আছেন প্রায় ২০ কোটি। ২০২৪ সালে মক্সিবাশনের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৮৮ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ইউয়ান।
এখন চিকিৎসার পাশাপাশি চীনে মোক্সা দিয়ে বেল্ট, পোশাক ও স্বাস্থ্যপণ্য বানানো হয়। এসব পণ্য তরুণদের মাঝেও ব্যাপক জনপ্রিয়।
মক্সিবাশ্চন আধুনিক বিজ্ঞানের কঠোর পরীক্ষায় হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও মানুষের বিশ্বাসকে এক কথায় বাতিল করাও সহজ নয়। আগুনের নিয়ন্ত্রিত স্পর্শে শরীরের গভীরে যে উষ্ণতা পৌঁছে যায়—তা শুধু তাপ নয়, তা মানুষের আশা, আস্থা আর সুস্থ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। তাই মক্সিবাশ্চন আজও টিকে আছে—কখনো হাসপাতালের কক্ষে, কখনো ঘরোয়া যত্নে, আবার কখনো আধুনিক আলোঝলমলে হাসপাতালের ভবনে।
সূত্র: সিএমজি বাংলা




















