আইনপেশায় প্রবেশে ৩৫ বছরের বয়সসীমা: যোগ্যতার চেয়ে বয়স বড়, নাকি আইনের শাসন? - Mati News
Thursday, October 29

আইনপেশায় প্রবেশে ৩৫ বছরের বয়সসীমা: যোগ্যতার চেয়ে বয়স বড়, নাকি আইনের শাসন?

বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক অধিকার ও ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের আলোকে একটি পর্যালোচনা। 

ভূমিকা

আইন পেশা কেবল জীবিকা নির্বাহের একটি মাধ্যম নয়; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একজন আইনজীবী আদালতে শুধু মক্কেলের প্রতিনিধিত্ব করেন না, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই আইন পেশায় প্রবেশের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইনজ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধকে প্রাধান্য দেওয়া প্রত্যাশিত।

এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখের সভায় গৃহীত এ সিদ্ধান্ত ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি ২০৩০ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

সিদ্ধান্তটি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সই কি যোগ্যতার নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি, নাকি যোগ্যতা, পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত নৈতিকতার ভিত্তিতেই একজন ব্যক্তির আইনজীবী হওয়ার উপযুক্ততা নির্ধারিত হওয়া উচিত?

আমার বিবেচনায়, এ সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি, যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা এবং সাংবিধানিক সামঞ্জস্য নিয়ে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। কারণ, বয়স কোনো ব্যক্তির আইনজ্ঞান, সততা, বিচারবোধ কিংবা পেশাগত দক্ষতার একমাত্র নির্ধারক নয়।

বাংলাদেশেরআইন কী বলে?

বাংলাদেশে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্তির মৌলিক আইনগত কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 দ্বারা।

এই আইনের Article 27(1)-এ অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য বাংলাদেশের নাগরিকত্ব, ন্যূনতম ২১ বছর বয়স, স্বীকৃত আইন বিষয়ে ডিগ্রি এবং অন্যান্য নির্ধারিত যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। মূল ধারাটিতে সর্বোচ্চ বয়সের নির্দিষ্ট সীমা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন সামনে আসে: মূল আইনে সর্বোচ্চ বয়সের নির্দিষ্ট সীমা না থাকলে, বার কাউন্সিল কোন আইনগত ক্ষমতাবলে ৩৫ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করেছে?

অবশ্যই বার কাউন্সিলের বিধি প্রণয়ন ও পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে মূল আইনের সীমার মধ্যে এবং প্রযোজ্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। তাই সিদ্ধান্তটির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বিধি, বিধি সংশোধনের প্রক্রিয়া, সরকারের প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন এবং আনুষ্ঠানিক প্রকাশনার বিষয়গুলো পরীক্ষা করা জরুরি।

এখানে প্রশ্নটি শুধু বয়সসীমার পক্ষে বা বিপক্ষে মতামতের নয়; এটি আইনগত কর্তৃত্বের সীমা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রশ্নও।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ: আইনের দৃষ্টিতে সমতা

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।

এই নীতির আলোকে প্রশ্ন করা যায়, একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, একই পরীক্ষা এবং একই পেশাগত মানদণ্ড পূরণকারী দুই ব্যক্তির মধ্যে কেবল বয়সের পার্থক্যের কারণে একজনকে আইন পেশায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে, আর অন্যজনকে দেওয়া হবে না—এমন ব্যবস্থার পেছনে কী যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে?

ধরা যাক, দুইজন প্রার্থীই স্বীকৃত আইন ডিগ্রিধারী, নির্ধারিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং পেশাগত নৈতিকতার শর্ত পূরণে সক্ষম। তাঁদের একজনের বয়স ৩৪ বছর, অন্যজনের ৩৬ বছর। দ্বিতীয়জনকে শুধু বয়সের কারণে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে—এই বয়সের পার্থক্য কি তাঁর আইনজ্ঞান, সততা কিংবা পেশাগত সক্ষমতার ওপর কোনো প্রাসঙ্গিক প্রভাব ফেলে?

অবশ্য সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ সব ধরনের শ্রেণিবিন্যাস নিষিদ্ধ করে না। বৈধ উদ্দেশ্যে যুক্তিসংগত শ্রেণিবিন্যাস করা যেতে পারে। তাই বয়সসীমাটি অসাংবিধানিক প্রমাণ করতে হলে শুধু বয়সের পার্থক্য দেখানো যথেষ্ট নয়; বরং প্রমাণ করতে হবে যে এই শ্রেণিবিন্যাসের যথেষ্ট যুক্তিসংগত ভিত্তি নেই অথবা এর প্রয়োগ সাংবিধানিক সমতার নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ: পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা

এই বিতর্কে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক সাংবিধানিক বিধানগুলোর একটি হলো সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ। এতে আইন দ্বারা নির্ধারিত পেশাগত যোগ্যতা সাপেক্ষে বৈধ পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে।

আইন পেশা একটি নিয়ন্ত্রিত পেশা। তাই এ পেশায় প্রবেশের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা, তালিকাভুক্তির পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত আচরণবিধি নির্ধারণ করা যেতে পারে। কিন্তু এসব শর্তের আইনগত ভিত্তি ও যৌক্তিকতাও থাকতে হবে।

কেউ ২৫ বছর বয়সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করবেন, নাকি ৩০ বছর বয়সে—তা তাঁর ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত ও পেশাগত জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কেউ চাকরির পাশাপাশি আইন পড়তে পারেন, কেউ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা অর্জনের পর আইন পেশায় আসতে পারেন, আবার কেউ পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা বা শিক্ষাজীবনের অনিবার্য বিলম্বের কারণে দেরিতে আইন ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন।

জীবনের এসব বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর পেশায় প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিলে তা পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে অনুচ্ছেদ ৪০ নিরঙ্কুশ অধিকার নয়; আইনসম্মত বিধিনিষেধের সুযোগ রয়েছে। ফলে ৩৫ বছরের সীমাটি এই অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নির্ভর করবে বিধিনিষেধটির আইনগত ভিত্তি, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতার ওপর।

আমার প্রশ্ন হলো, আইন পেশার মানোন্নয়নের জন্য যখন পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতার কঠোর মানদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব, তখন সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণের মতো সীমাবদ্ধতামূলক পদক্ষেপ কেন অপরিহার্য?

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

এই বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

মামলা: Indian Council of Legal Aid & Advice v. Bar Council of India

রায়ের তারিখ: ১৭ জানুয়ারি ১৯৯৫

রিপোর্টেড সাইটেশন: (1995) 1 SCC 732; AIR 1995 SC 691

আদালত: Supreme Court of India।

ভারতের Bar Council of India ১৯৯৩ সালে তাদের বিধিমালায় Rule 9 সংযোজন করে। ওই বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্তির আবেদন করার সময় ৪৫ বছর বয়স পূর্ণ করে থাকলে তাঁকে তালিকাভুক্ত করা যাবে না।

এই বিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা করা হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল, Advocates Act, 1961-এর অধীনে বার কাউন্সিলের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা ব্যবহার করে আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা আরোপ করা যায় কি না।

আদালত দেখতে পায়, আইনের Section 24-এ তালিকাভুক্তির জন্য ন্যূনতম ২১ বছর বয়স নির্ধারিত থাকলেও সাধারণভাবে সর্বোচ্চ বয়সের সীমা উল্লেখ করা হয়নি। আদালত আরও ব্যাখ্যা করে যে, Section 49(1)(ah)-এর অধীনে পেশায় ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের অনুশীলনসংক্রান্ত শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন প্রার্থীদের প্রবেশে সর্বোচ্চ বয়সের বাধা সৃষ্টি করা যায় না।

আদালত সংশ্লিষ্ট Rule 9-কে আইনগত ক্ষমতাবহির্ভূত (#ultra #vires) বলে বাতিল করে। রায়ের আলোচনায় ভারতের সংবিধানের Article 14-এর সমতা এবং Article 19(1)(g)-এর পেশা বা ব্যবসা পরিচালনার স্বাধীনতার প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছিল।

এই রায় থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: বার কাউন্সিলের মতো পেশা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতারও আইনগত সীমা রয়েছে। পেশাগত মান রক্ষার উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই উদ্দেশ্যে নতুন কোনো বাধা আরোপের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনে ক্ষমতা থাকতে হবে।

তবে ভারতের এই রায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরাসরি বাধ্যতামূলক নয়। দুই দেশের আইনগত কাঠামো এক নয়। বাংলাদেশের ৩৫ বছর বয়সসীমার বৈধতা নির্ধারণ করতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব আইন, বিধিমালা এবং সংবিধানের আলোকে। তা সত্ত্বেও, আইনগত ক্ষমতার সীমা ও বয়সভিত্তিক বাধার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণে ভারতের রায়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক বিচারিক নজির।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রাসঙ্গিক অবস্থান

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের  Civil Appeal No. 235 of 2014-এর রায়, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, আইন পেশা নিয়ন্ত্রণ এবং পেশাগত অধিকারসংক্রান্ত আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

তবে ওই মামলার মূল প্রশ্ন ছিল অবসরপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অধস্তন আদালতে আইন পেশা পরিচালনার ওপর বিধিনিষেধের বৈধতা। এটি সরাসরি অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণের মামলা ছিল না। 

এই রায়ের গুরুত্ব হলো, আদালত বার কাউন্সিলের বিধি ও পেশাগত বিধিনিষেধকে সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৪০ অনুচ্ছেদের আলোকে পরীক্ষা করেছে। ফলে পেশাগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইনগত কর্তৃত্ব, যুক্তিসংগততা এবং সাংবিধানিক অধিকার বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য এটি প্রাসঙ্গিক।

তবে এই রায়কে ৩৫ বছরের বয়সসীমার বিরুদ্ধে সরাসরি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। বর্তমান সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হলে এর নিজস্ব আইনগত ভিত্তি ও প্রক্রিয়া পরীক্ষা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বয়স, যোগ্যতা ও পেশাগত মান

অন্যান্য দেশের আইন পেশায় প্রবেশের ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলেও একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—প্রতিটি দেশের আইনগত কাঠামো আলাদা, তাই সরলভাবে এক দেশের নিয়ম অন্য দেশে প্রয়োগ করা যায় না।

ভারতে ১৯৯৫ সালের রায়ে ৪৫ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাতিল করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সলিসিটর হওয়ার পথে Solicitors Qualifying Examination (SQE), প্রযোজ্য ক্ষেত্রে qualifying work experience এবং পেশাগত উপযুক্ততার শর্ত রয়েছে। সিঙ্গাপুরেও বার-এ ভর্তির জন্য ন্যূনতম বয়স, চরিত্র, প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার নিয়ম অঙ্গরাজ্যভেদে আলাদা, আর কানাডায় প্রদেশভেদে ভর্তি-সংক্রান্ত বিধি নির্ধারিত হয়।

এসব ব্যবস্থার উল্লেখ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না যে, বিশ্বের সব দেশেই সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। বরং আন্তর্জাতিক তুলনার মূল শিক্ষা হলো, আইন পেশায় প্রবেশের শর্ত নির্ধারণে পেশাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা এবং নৈতিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশেও আইন পেশার মান উন্নয়নের জন্য এসব উপাদানের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো যেতে পারে। সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের আগে প্রমাণভিত্তিকভাবে দেখানো প্রয়োজন যে, নির্দিষ্ট বয়সের পর তালিকাভুক্তি বন্ধ করা পেশাগত মান রক্ষার জন্য কেন প্রয়োজনীয়।

বয়স কি পেশাগত দক্ষতার নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি?

আইন পেশার মূল ভিত্তি হলো আইনজ্ঞান, যুক্তি বিশ্লেষণের ক্ষমতা, গবেষণা, সততা, দায়িত্বশীলতা এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব ধারণা।

একজন তরুণ আইনজীবী যেমন দক্ষ ও সৎ হতে পারেন, তেমনি অধিক বয়সী একজন ব্যক্তিও আইন পেশায় উচ্চমানের অবদান রাখতে পারেন। আবার কম বয়স বা বেশি বয়স—কোনোটিই একা পেশাগত দক্ষতার নিশ্চয়তা দেয় না।

যদি উদ্দেশ্য হয় দক্ষ আইনজীবী তৈরি করা, তাহলে আইন শিক্ষার মান উন্নয়ন, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, কার্যকর শিক্ষানবিশি, পেশাগত নৈতিকতার শিক্ষা এবং মানসম্মত তালিকাভুক্তি পরীক্ষা আরও সরাসরি উপায় হতে পারে।

এখানে প্রশ্নটি বয়সের কোনো গুরুত্ব নেই—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বয়সকে আইন পেশায় প্রবেশের চূড়ান্ত বাধা হিসেবে ব্যবহারের যথেষ্ট আইনগত ও পেশাগত ভিত্তি রয়েছে কি না।

অন্য পেশা থেকে আইন পেশায় আসার সুযোগ

আমাদের সমাজে অনেকে জীবনের প্রথম পর্যায়ে চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত থাকেন। পরে তাঁরা আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে আইন পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি নেন।

ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান, কর, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আইনগত ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন। তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা বাণিজ্যিক বিরোধ, কর আইন, ব্যাংকিং, কোম্পানি আইন বা অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। অবশ্য পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ আইনজীবী হয়ে যান না; তাঁকেও সব আইনগত যোগ্যতা, পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের শর্ত পূরণ করতে হবে।

কিন্তু বয়সসীমার কারণে এমন যোগ্য ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হলে আইন পেশা সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার একটি উৎস থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

আইন পেশার স্বার্থে তাই শুধু নতুন আইনজীবী তৈরির বিষয়টি নয়, বরং ভিন্ন পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে আসা যোগ্য ব্যক্তিদের অবদান রাখার সুযোগও বিবেচনা করা উচিত।

২০৩০ সাল থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত কি যথেষ্ট?

বার কাউন্সিলের প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বর্তমানে এলএলবি অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় বয়সসীমা ১ জানুয়ারি ২০৩০ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। 

এই সময়সীমা বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্বর্তী সুযোগ তৈরি করার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত হয়ে থাকতে পারে। তবে কার্যকর হওয়ার তারিখ পিছিয়ে দেওয়া এবং সিদ্ধান্তের মৌলিক আইনগত যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।

যাঁরা চাকরি বা ব্যবসার পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, যাঁরা বিলম্বে আইন ডিগ্রি অর্জন করেছেন, কিংবা যাঁদের শিক্ষাজীবন অনিবার্য কারণে দীর্ঘ হয়েছে—তাঁদের পরিস্থিতিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া বয়স গণনার নির্দিষ্ট তারিখ, সিদ্ধান্ত কার্যকরের সময় বিদ্যমান প্রার্থীদের অবস্থা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো ছাড় থাকবে কি না—এসব বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি।

একটি ন্যায়সংগত নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত পেশাগত মান বজায় রাখা এবং অযথা বঞ্চনা এড়ানো। শুধু একটি ভবিষ্যৎ তারিখ নির্ধারণ করলেই সব ধরনের ন্যায়সংগতির প্রশ্নের সমাধান হয় না।

পেশাগত মানোন্নয়নের বিকল্প পথ

বার কাউন্সিলের দায়িত্ব আইন পেশার মান, মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও পেশাগত নৈতিকতা রক্ষা করা। এই দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্যতা নির্ধারণ, পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং অসদাচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

কিন্তু পেশার মানোন্নয়নের নামে এমন কোনো শর্ত আরোপ করা হলে, যা উদ্দেশ্য অর্জনে অপরিহার্য নয় কিংবা যোগ্য ব্যক্তিদের অযথা বঞ্চিত করে, তাহলে সেই শর্তের যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে—

১. তালিকাভুক্তির পরীক্ষার মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

২. বাধ্যতামূলক ও মানসম্মত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ জোরদার করা।

৩. শিক্ষানবিশির বাস্তব কার্যকারিতা ও তদারকি বৃদ্ধি করা।

৪. পেশাগত নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।

৫. বয়সের পরিবর্তে প্রকৃত পেশাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

৬. প্রয়োজন হলে বিশেষ পরিস্থিতিতে ন্যায়সংগত ব্যতিক্রম বা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বিবেচনা করা।

এসব বিকল্পের কার্যকারিতাও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। তবে পেশাগত মানোন্নয়ন ও ন্যায়সংগত সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির জন্য এগুলো অর্থবহ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে।

কী হওয়া উচিত এখন?

৩৫ বছরের বয়সসীমা নিয়ে বিতর্ককে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা উচিত:

* সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি প্রকাশ করা।

* সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনুসৃত প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

* বয়সসীমার পক্ষে প্রাসঙ্গিক তথ্য, যুক্তি ও গবেষণা উপস্থাপন করা।

* সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৪০ অনুচ্ছেদের আলোকে সিদ্ধান্তটির সামঞ্জস্য পর্যালোচনা করা।

* আইনজীবী, আইন শিক্ষার্থী, শিক্ষানবিশ আইনজীবী এবং অন্যান্য অংশীজনের মতামত গ্রহণ করা।

* পেশাগত মান বজায় রেখে যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়সংগত সুযোগ নিশ্চিত করার বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা।

প্রয়োজনে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা, সংশোধন অথবা যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

 উপসংহার: বয়স নয়, যোগ্যতা ও নৈতিকতাই হোক প্রধান বিবেচনা

আইন পেশা একটি মহান দায়িত্বের ক্ষেত্র। এই পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, আইনজ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বয়সকে পেশাগত সক্ষমতার একমাত্র বা চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার আগে তার প্রয়োজনীয়তা ও আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সমতার নীতি, ৩১ অনুচ্ছেদের আইনানুগ আচরণের অধিকার এবং ৪০ অনুচ্ছেদের পেশা গ্রহণের স্বাধীনতার আলোকে ৩৫ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমার সিদ্ধান্তটি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বার কাউন্সিলের আইনগত ক্ষমতা, প্রযোজ্য বিধিমালা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও যাচাই করতে হবে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ১৯৯৫ সালের ঐতিহাসিক রায় দেখিয়েছে যে, পেশা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ এবং বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার বৈধতা বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে। যদিও সেই রায় বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বাধ্যতামূলক নয়, তবু এটি আমাদের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক দৃষ্টান্ত।

আমার অবস্থান হলো, আইন পেশার মানোন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত প্রতিটি বিধিনিষেধের পক্ষে থাকতে হবে সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি, গ্রহণযোগ্য যুক্তি এবং ন্যায়সংগত প্রয়োগের ব্যবস্থা।

আইন পেশায় প্রবেশের দরজা অবারিত হওয়া উচিত—এমন দাবি নয়; বরং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনকারী নাগরিকদের জন্য সেই দরজা বন্ধ করার ক্ষেত্রেও থাকতে হবে সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি, প্রমাণভিত্তিক যুক্তি এবং সাংবিধানিক ন্যায্যতা।

আইন পেশায় বয়সের চেয়ে যোগ্যতা, পরিচয়ের চেয়ে নৈতিকতা এবং বিধিনিষেধের চেয়ে ন্যায়সংগত আইন প্রয়োগই হোক আমাদের মূলনীতি।

তথ্যসূত্র

১. The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972, Article 27 ও প্রাসঙ্গিক বিধান। [বাংলাদেশের সরকারি আইনভান্ডার](https://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-387.html)

২. Indian Council of Legal Aid & Advice v. Bar Council of India, (1995) 1 SCC 732; AIR 1995 SC 691, Supreme Court of India, 17 January 1995. [পূর্ণাঙ্গ রায়](https://indiankanoon.org/doc/1542937/)

৩. Supreme Court of Bangladesh, Appellate Division, Civil Appeal No. 235 of 2014, judgment dated 8 February 2017. [পূর্ণাঙ্গ রায়](https://www.supremecourt.gov.bd/translation/process.php?file=1094893_Civil_Appeal_235_of2014.pdf)

৪. বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ৩৫ বছর বয়সসীমা-সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি, ২৭ অক্টোবর ২০২৬। [বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর প্রতিবেদন](https://www.bssnews.net/bangla/news/353909)

মো. মিজানুর রহমান, বিবিএ, এমবিএ, এলএলবি, পিজিডি (ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস ম্যানেজমেন্ট), আইটিপি; 

আয়কর আইনজীবী, চট্টগ্রাম ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশন এবং শিক্ষানবিশ আইনজীবী, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতি।

01679803510

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *