বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ বিআরআই প্রকল্প এবং ডব্লিউএসসিসি থিংক ট্যাংকের সুপারিশ - Mati News
Thursday, October 29

বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ বিআরআই প্রকল্প এবং ডব্লিউএসসিসি থিংক ট্যাংকের সুপারিশ

অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন, পিএসসি, এমবিএ, এমডিএস

বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রম করেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এ সম্পর্ক বর্তমানে কেবল কূটনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীনের সহযোগিতা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। একই সঙ্গে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

চীনা ভাষা শিক্ষা এবং বাংলাদেশ–চীন বন্ধুত্ব উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সরকার নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডব্লিউএসসিসি) দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গবেষণা, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, নীতিগত আলোচনা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানের থিংক ট্যাংকে বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক, শিক্ষা, কূটনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ যুক্ত রয়েছেন। তাঁরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশ্লেষণ করে গঠনমূলক মতামত ও সুপারিশ প্রদান করে থাকেন।

২০২৪ সালের ২০ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ভবনে অনুষ্ঠিত “চীন–বাংলাদেশ সম্পর্ক ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আমি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ–চীন সহযোগিতার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রস্তাব উপস্থাপন করি। আমার বিশ্বাস, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

প্রথমত, দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে। রাজধানীকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধার পরিবর্তে বিভাগভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করবে। এটি আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসেও সহায়ক হবে।

দ্বিতীয়ত, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে ঢাকার সঙ্গে উচ্চগতির রেলপথে সংযুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পর্যটন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আধুনিক রেল যোগাযোগ অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, বঙ্গোপসাগরভিত্তিক ব্লু ইকোনমির বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সমুদ্রভিত্তিক শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

চতুর্থত, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি দক্ষতা, চীনা ভাষা শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণের জন্য একটি বৃহৎ ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। বাংলাদেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পঞ্চমত, ঢাকার বাইরে কিন্তু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে সহজ যোগাযোগসম্পন্ন স্থানে একটি সমন্বিত চীন–বাংলাদেশ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এ কমপ্লেক্সে ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রদর্শনী, কনভেনশন সেন্টার, সাংস্কৃতিক বিনিময়, পর্যটন, বিনিয়োগ সহায়তা, আবাসন, ক্রীড়া ও বিনোদন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এটি দুই দেশের জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

ডব্লিউএসসিসি থিংক ট্যাংকের অভিমত হলো, ভবিষ্যৎ বিআরআই প্রকল্পগুলো শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো খাতেও বিস্তৃত করা উচিত। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত সুফল তখনই নিশ্চিত হবে যখন সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।

এক্ষেত্রে বিশেষ বিআরআই প্রকল্পগুলোকে পর্যায়ক্রমে (ফেজভিত্তিক) অগ্রাধিকার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ে উচ্চগতির রেল যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চল এবং লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তৃতীয় পর্যায়ে ব্লু ইকোনমি, গবেষণা, উদ্ভাবন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উচ্চ প্রযুক্তিভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এ ধরনের পরিকল্পিত বাস্তবায়ন বাংলাদেশের উন্নয়নকে আরও টেকসই ও ফলপ্রসূ করে তুলবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর, কৌশলগত সংলাপ এবং যৌথ উদ্যোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরেই ডব্লিউএসসিসি থিংক ট্যাংকের আলোচনার অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়।

বাংলাদেশ ও চীন যখন তাদের সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করছে, তখন এ সম্পর্কের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ–চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পারস্পরিক আস্থা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণকেন্দ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীন এমন একটি সহযোগিতার মডেল প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যা শুধু দুই দেশের জনগণের জন্যই নয়, সমগ্র অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অবদান রাখবে।

ভবিষ্যতেও উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডব্লিউএসসিসি)-এর থিংক ট্যাংক গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং গঠনমূলক সুপারিশের মাধ্যমে বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। আমাদের বিশ্বাস, দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া আগামী দিনগুলোতে আরও গভীর হবে এবং বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক একটি নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে।

লেখক:

অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন, পিএসসি, এমবিএ, এমডিএস

প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডব্লিউএসসিসি)

অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর, ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ (আইপিএল), বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ)

বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি (বিএলসিইউ), চীন থেকে চীনা ভাষায় স্নাতক

পাঁচটি বেসিক চীনা ভাষা পাঠ্যবইয়ের রচয়িতা

চীন–বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৩ প্রাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *