একটি সুন্দর দেশ গড়তে প্রয়োজন মাদক ও জুয়ামুক্ত সমাজ - Mati News
Thursday, April 16

একটি সুন্দর দেশ গড়তে প্রয়োজন মাদক ও জুয়ামুক্ত সমাজ

স্বপন বিশ্বাস

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু উঁচু অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক, বড় বড় সেতু কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে মানুষের নৈতিকতা, সামাজিক স্থিতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের ওপর। যে সমাজে মানুষ নিরাপদ, সচেতন, কর্মমুখী ও নৈতিকভাবে দৃঢ়—সেই সমাজই একটি সুন্দর দেশের ভিত্তি নির্মাণ করে। আর এই ভিত্তিকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে দেয় দুটি ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি—মাদক এবং জুয়া।


মাদক শুধু একটি ব্যক্তির শরীর নষ্ট করে না; এটি ধীরে ধীরে একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলে, অর্থনৈতিক স্থিতি ধ্বংস করে এবং সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটায়। একজন তরুণ যখন মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সে কেবল নিজের ভবিষ্যৎ নয়, পরিবারের স্বপ্নও ধ্বংস করে। প্রথমে কৌতূহল, পরে বন্ধুমহলের প্ররোচনা, এরপর অভ্যাস—এই তিন ধাপেই বহু তরুণ অন্ধকারে হারিয়ে যায়। মাদকের প্রভাবে মানুষের বিবেক দুর্বল হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়, আর তখনই চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা, এমনকি হত্যার মতো অপরাধও সহজ হয়ে ওঠে।


আজ গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই মাদকের ছোবল দৃশ্যমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে, বাজার এলাকায়, এমনকি কিছু আবাসিক অঞ্চলেও মাদক সরবরাহের গোপন চক্র সক্রিয়। ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—অনেক শিক্ষিত তরুণও এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে। কারণ শুধু আইন দিয়ে মাদক রোধ করা যায় না; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার সম্মিলিত ভূমিকা।


অন্যদিকে জুয়া এমন এক নেশা, যা মানুষকে ধীরে ধীরে পরিশ্রমবিমুখ করে তোলে। অল্প সময়ে বড় লাভের মোহে মানুষ নিজের উপার্জিত অর্থ, সঞ্চয়, এমনকি সংসারের প্রয়োজনীয় সম্পদও হারিয়ে ফেলে। জুয়ার আসরে মানুষ প্রথমে ছোট অঙ্কে শুরু করলেও পরে তা জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। অনেক পরিবারে দেখা যায়—একজন সদস্যের জুয়ার কারণে সংসারে অশান্তি, ঋণ, দাম্পত্য কলহ, সন্তানদের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাঘাত, এমনকি সামাজিক অপমানও নেমে আসে।


বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে অনলাইন জুয়া নতুন বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মোবাইল ফোন হাতে থাকলেই নানা অ্যাপ, বেটিং সাইট, গেমিংয়ের নামে অর্থ লেনদেন—এসবের মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অনেকেই এটিকে বিনোদন মনে করলেও অল্প সময়েই তা ভয়ংকর আসক্তিতে রূপ নেয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই নেশা গোপনে ঘটে বলে পরিবার অনেক সময় বুঝতেই পারে না।


একটি সুন্দর দেশ গড়তে হলে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হবে। কারণ আজকের তরুণই আগামী দিনের রাষ্ট্রনির্মাতা। যে তরুণের হাতে বই থাকার কথা, সে যদি মাদকের প্যাকেট বা জুয়ার মোবাইল স্ক্রিনে ডুবে থাকে, তবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠ্যবই নয়, নৈতিক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।


পরিবার এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তানের বন্ধু কারা, কোথায় যাচ্ছে, কী দেখছে, কী ভাবছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকের আন্তরিক নজর প্রয়োজন। শুধু শাসন নয়, বন্ধুসুলভ সম্পর্কই সন্তানকে বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। যে পরিবারে কথোপকথন আছে, স্নেহ আছে, মূল্যবোধ আছে—সেখানে বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।


ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব আছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা—সব জায়গা থেকেই নৈতিকতার আহ্বান আসতে পারে। কারণ মানুষ যখন ভেতর থেকে সচেতন হয়, তখন আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়ার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও দরকার। শুধু শাস্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না; যারা আসক্ত, তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, কর্মসংস্থান—এসবের মাধ্যমে অনেক জীবন আবার নতুন করে শুরু করতে পারে।

সাংস্কৃতিক চর্চাও বড় শক্তি হতে পারে। খেলাধুলা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, পাঠাগার—এসব মানুষকে সুস্থ আনন্দের পথ দেখায়। যে তরুণ মাঠে যায়, বই পড়ে, সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত থাকে—সে সহজে ধ্বংসের পথে যায় না।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি দেশ শুধু সরকারের নয়, নাগরিকেরও। আমরা যদি নিজের পরিবার, পাড়া, গ্রাম, শহরকে সচেতন রাখি, তবে জাতীয় পরিবর্তন সম্ভব। একজন মানুষ মাদক ছাড়লে একটি পরিবার বাঁচে; একটি পরিবার বাঁচলে সমাজ শক্তিশালী হয়; সমাজ শক্তিশালী হলে দেশ সুন্দর হয়।

একটি মাদক ও জুয়ামুক্ত সমাজ মানে শুধু অপরাধ কমে যাওয়া নয়—এর অর্থ হলো সুস্থ প্রজন্ম, নিরাপদ পরিবার, কর্মমুখী মানুষ এবং নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সুন্দর দেশ গড়ার স্বপ্ন কেবল স্লোগানে নয়, বাস্তব জীবনের আচরণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
……..
স্বপন বিশ্বাস
কবি ও কলামিস্ট
শালিখা মাগুরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *