তবে কি আমরা না খেয়ে মরবো - Mati News
Sunday, August 23

তবে কি আমরা না খেয়ে মরবো

একটা খারাপ খবর দিয়ে শুরু করি।

মোটামুটি কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। তখন শিল্পকারখানা, রান্নাবান্না কিংবা যানবাহনের জ্বালানি—কোনো ক্ষেত্রেই দেশীয় গ্যাসের ওপর আগের মতো ভরসা করা যাবে না।

অর্থাৎ, আমাদের আরও বেশি নির্ভর করতে হবে আমদানি করা গ্যাসের ওপর। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই আমদানিও কতটা নিরবচ্ছিন্ন থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সামনে বৈশ্বিক অস্থিরতা কমার চেয়ে বাড়ার সম্ভাবনাই যদি বেশি হয়, তাহলে গ্যাসের সংকটও দিন দিন তীব্র হতে পারে।

এর আঁচ আমরা ইতিমধ্যেই পাচ্ছি।

আমি কিছুদিন আমেরিকান তেল ও গ্যাস কোম্পানি শেভরনে হেলথ স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেছি। বাংলাদেশের গ্যাস খাতের বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।

শেভরনের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্রগুলোর একটি হবিগঞ্জের বিবিয়ানা। উৎপাদনের শুরুর দিকে, ২০০৭ সালের দিকে, এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো। এখন উৎপাদন কমে এসেছে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

মজুদের স্বাভাবিক ক্ষয় তো আছেই। তার সঙ্গে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। শেভরন বিভিন্ন সময়ে স্বল্প পরিসরে অনুসন্ধান চালিয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত সাফল্য খুব বেশি আসেনি।

আর এখানেই আমাদের মূল সমস্যাটা।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুসন্ধান ও উত্তোলন সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। ইতিহাসেও এর নজির কম নয়।

১৯৫৫ সালে পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম সিলেটের হরিপুরে গ্যাসকূপ খননের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। আজও হরিপুরে গেলে মাটির নিচ থেকে গ্যাসের বুদবুদ বের হতে দেখা যায়। কোথাও পুকুরের পানিতে, কোথাও বালুর মধ্যে, কোথাও আবার ছোট ছোট গর্তে আগুন ধরিয়ে সেই গ্যাসের উপস্থিতি বোঝা যায়।

ভাবুন তো, সেই গ্যাসক্ষেত্রটি যদি আজও আগের সক্ষমতা নিয়ে অক্ষত থাকত, তাহলে আমাদের বর্তমান গ্যাস-দুশ্চিন্তার একটা বড় অংশ হয়তো থাকতই না।

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড কিংবা বাপেক্স—দেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিষ্ঠান থাকলেই হবে না; দরকার আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সবচেয়ে বড় কথা—সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।

গ্যাসক্ষেত্রকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়—অনশোর ও অফশোর। স্থলভাগে অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্র অনশোর, আর সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্র অফশোর।

বাংলাদেশের স্থলভাগে নতুন বড় গ্যাস আবিষ্কারের সম্ভাবনা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের তাকাতে হবে সমুদ্রের দিকে।

বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমার নিচে কী আছে, আমরা আসলে কতটা জানি?

এখানেই আরেকটি অদ্ভুত প্রশ্ন সামনে আসে।

শেভরনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখিয়েছে—এমন আলোচনা বহুবার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিদেশি দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে আমাদের নীতিগত অবস্থান সবসময় খুব পরিষ্কার ছিল না।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আমাদের নির্ভরতা অব্যাহত আছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল রাষ্ট্রীয় বলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আবার বেসরকারি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠান মানেই ভালো—এমন সরল সিদ্ধান্তেও যাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন হওয়া উচিত একটাই: কে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে দক্ষ, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারবে?

কারণ সমস্যা এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরের আশঙ্কা নয়। সমস্যা দরজায় কড়া নাড়ছে।

তাহলে উপায় কী?

আমরা কি না খেয়ে মরব?

আমাদের গ্রামে একসময় উঠোনে যাত্রাপালা হতো। আজিজার নামে এক জেলে সেই যাত্রায় অভিনয় করত। ‘কাসেম মালার প্রেম’ যাত্রায় একসময় নিরুপায় হয়ে আজিজার বলত—

“জাঁহাপনা, আমি কি তাহলে এখন না খেয়েই মরব?”

আজিজার মাছ ধরত ‘হ্যাঙ্গা’ নামের এক ধরনের যন্ত্র দিয়ে। তার ওই সংলাপ শেষ হতে না হতেই দুষ্টু ছেলেপেলেরা পাশ থেকে চিৎকার করে উঠত—

“না না না, তা হইবে কেন? তুমি হ্যাঙ্গা ঠেলে খাও!”

আমাদের অবস্থাও যেন এখন অনেকটা সেই রকম।

তবে আমাদের হাতে সত্যিই একটা ‘হ্যাঙ্গা’ আছে।

তার নাম—নবায়নযোগ্য জ্বালানি।

সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস এর সবচেয়ে সহজ উদাহরণ।

বাংলাদেশের মতো দেশে সূর্যের আলো কোনো আমদানিকৃত পণ্য নয়। গ্রামের কৃষকের খামারে উৎপন্ন জৈববর্জ্যও কোনো বিদেশি মুদ্রা খরচ করে কিনতে হয় না। অথচ পরিকল্পিতভাবে এগুলো ব্যবহার করতে পারলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

আমি যদি বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় থাকতাম, তাহলে দেশের প্রতিটি নতুন বাড়ি, সরকারি ভবন, শিল্পকারখানা ও বড় স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য বাধ্যতামূলক নীতি করতাম। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য দিতাম বড় ধরনের ভর্তুকি ও সহজ ঋণ।

একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে কৃষি ও পশুপালনের সঙ্গে বায়োগ্যাসকে যুক্ত করতাম। একটি খামারের গোবর শুধু বর্জ্য নয়—সেটি জ্বালানি। কৃষিজ বর্জ্য শুধু ফেলে দেওয়ার বস্তু নয়—সঠিক প্রযুক্তিতে সেটিও শক্তির উৎস।

আর প্রযুক্তি ও নীতির সমন্বয় ঘটাতে পারলে গল্পটা আরও সুন্দর হতে পারে।

একটি বাড়ি নিজের বিদ্যুৎ নিজে উৎপাদন করবে। একটি খামার নিজের রান্নার গ্যাস তৈরি করবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাবে। হাজার হাজার বাড়ি, খামার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মিলে তৈরি করবে একটি বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থা।

অর্থাৎ, শুধু বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়—আমি, আপনি, আপনার বাড়ির ছাদ, গ্রামের কৃষকের খামার, এমনকি আপনার বাড়ির ছাগলটিও জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অংশ হয়ে যেতে পারে!

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাস কোম্পানি ও অন্যান্য স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব এবং লবিং আছে—এটা সত্য। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতিকে শুধু কোনো একটি গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, নীতিমালা ও বাজার—সবকিছুর সমন্বয়েই জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তববাদী জ্বালানি নীতি।

দেশীয় গ্যাস যতদিন আছে, তার দক্ষ ও নিরাপদ ব্যবহার করতে হবে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় কাজে লাগাতে হবে।

একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু স্লোগান দিয়ে নয়—বাস্তব পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, গ্রিড অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির মাধ্যমে।

কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু গ্যাসের নিরাপত্তা নয়। এটি শিল্পের নিরাপত্তা, কৃষির নিরাপত্তা, পরিবহনের নিরাপত্তা, খাদ্যের নিরাপত্তা—শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা।

সামনে কঠিন সময় আসতে পারে। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আমার একটাই আবেদন—ফাঁকা বুলি নয়, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাপ্রোচ নিন। কাউকে তুষ্ট করার চেয়ে সাধারণ মানুষকে অগ্রাধিকার দিন। রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিন।

আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত হয়তো আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশকে একটি বড় সংকট থেকে বাঁচাতে পারে।

আর তখন ইতিহাস হয়তো সত্যিই বলবে—সেই সময় যারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় ছিলেন, তারা শুধু ক্ষমতা চালাননি; তারা ভবিষ্যৎও তৈরি করেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *