ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: চরম অস্বস্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো - Mati News
Wednesday, August 26

ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: চরম অস্বস্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো

ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে এবার অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানকে শান্তিচুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য করার লক্ষ্য নিয়ে কঠোর অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার নীতি গ্রহণ করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট সম্প্রতি ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামক এই নতুন অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন, যার মূল লক্ষ্য ইরানের আয়ের অবশিষ্ট উৎসগুলো বন্ধ করে দেওয়া। ব্যাসেন্ট একে ইরানের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আর্থিক আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যারা তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাবে, তারাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। এরই মধ্যে হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৬০টি প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

এই নতুন মার্কিন কৌশল উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এক জটিল ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। একদিকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কারণে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের চাপে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই গত সপ্তাহে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় কোনো দেশ যদি এই ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ নেয়, তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তারা এক ফোঁটা তেলও বের হতে দেবে না। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রধান পথ হওয়ায় এই হুমকি অঞ্চলটির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং গত সপ্তাহে আবুধাবি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবনের মতে, ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় ইউএই ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাই ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্কের খাতিরে তারা এই পথ বেছে নিয়েছে। তবে বিশ্লেষক মিয়াদ মালেকির মতে, দুবাই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করায়, ইউএইর এই সিদ্ধান্ত তেহরানের জন্য বড় অর্থনৈতিক আঘাত হতে পারে।

তবে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের কৌশল ভিন্ন। বিশেষ করে কাতার ও ইরানের মধ্যে বিশাল গ্যাসক্ষেত্র ভাগাভাগি থাকায় দোহার জন্য তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং এলএনজি স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি কাতারের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। ওমানও একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রাখতে দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রাখছে। ওমান বর্তমানে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরাসরি তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

সৌদি আরবের অবস্থানও আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তববাদী। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর থেকে রিয়াদ ওয়াশিংটনের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’র মাধ্যমে সৌদি আরব নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ ইরানকে দুর্বল দেখতে চাইলেও, সরকার পতনের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা বা ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলার ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়।

দোহার সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি রিসার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট রশিদ আল-মোহান্নাদ মনে করেন, বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা করছে। তবে ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা খোশচেশমের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা মূলত একটি ‘রাজনৈতিক প্রদর্শনী’, যার লক্ষ্য প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভয় দেখানো। তিনি একে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন, যা শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছিল।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসির মতে, ইরান সাধারণত আত্মসমর্পণ না করে উত্তেজনা বাড়ানোর পথই বেছে নেয়। ফলে নতুন এই নিষেধাজ্ঞা তেহরানকে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। এখন চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো ওয়াশিংটনের এই নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি কতটা গ্রহণ করবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই কৌশলের চূড়ান্ত কার্যকারিতা। শেষ পর্যন্ত উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভবত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চেয়ে সংলাপ ও কূটনীতির পথেই বেশি জোর দেবে, কারণ তাদের জন্য এই মুহূর্তে ইরানকে চরম চাপে রাখা এবং সংঘাত এড়ানো—উভয়ই সমান চ্যালেঞ্জিং। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ, নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা হলেও ইরান পাল্টা হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর ওয়াশিংটনের কৌশলে এই পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার ভাষ্য, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন উদ্যোগে সহযোগিতা না করলে কোনো ব্যাংক বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এই কৌশল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কঠিন এক সমীকরণের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবার সেই সামরিক উপস্থিতিই তাদের ভূখণ্ডকে ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য বানাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *