৭৬ বছর পেরিয়েও অমলিন আকিরা কুরোসাওয়ার কালজয়ী সিনেমা 'রাশোমন - Mati News
Thursday, August 27

৭৬ বছর পেরিয়েও অমলিন আকিরা কুরোসাওয়ার কালজয়ী সিনেমা ‘রাশোমন

সত্যের স্বরূপ কী? মানব ইতিহাসের এই চিরন্তন ও জটিল প্রশ্নটিকে সেলুলয়েডের ফিতায় ধারণ করে বিশ্ব চলচ্চিত্রকে নতুন পথ দেখিয়েছিলেন জাপানি নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়া। আজ থেকে ৭৬ বছর আগে, ১৯৫০ সালের ২৬ আগস্ট জাপানের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় তাঁর কালজয়ী সাদাকালো চলচ্চিত্র ‘রাশোমন’। মুক্তির সময় হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি যে, এই একটি ছবি শুধু জাপানি সিনেমার ইতিহাসই বদলে দেবে না, বরং বিশ্বজুড়ে সত্য, স্মৃতি ও মানবচরিত্রকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টে দেবে।

১৯১০ সালে টোকিওতে জন্ম নেওয়া আকিরা কুরোসাওয়ার শৈশবের স্বপ্ন ছিল চিত্রশিল্পী হওয়ার। তরুণ বয়সে পশ্চিমা ও জাপানি শিল্পকলার নানা ধারা নিয়ে তাঁর গভীর পড়াশোনা ছিল। ১৯৩৬ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখলেও, তাঁর ভেতরে থাকা সেই শিল্পীসত্তা কখনো হারিয়ে যায়নি। কুরোসাওয়ার প্রতিটি ফ্রেমে আলো-ছায়ার নিপুণ ব্যবহার, চরিত্রের সুবিন্যস্ত অবস্থান এবং আবহাওয়ার নাটকীয় প্রয়োগে এক অনন্য নান্দনিকতা ফুটে উঠত। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী জাপানের সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক সংকটকে তিনি নিজস্ব ভাষায় পর্দায় তুলে ধরেছিলেন।

কুরোসাওয়ার আন্তর্জাতিক সাফল্যের বড় মাইলফলক ছিল ‘রাশোমন’। ১৯৫১ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার অর্জন করে এবং পরের বছর সম্মানসূচক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এই সাফল্যের মাধ্যমেই পশ্চিমা বিশ্বের কাছে জাপানি সিনেমার নিজস্ব নন্দনভাষা ও দার্শনিক গভীরতা উন্মোচিত হয়। রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার ‘ইন আ গ্রোভ’ গল্প থেকে অনুপ্রাণিত এই সিনেমার কাহিনি আবর্তিত হয় কিয়েতোর রাশোমন গেটকে কেন্দ্র করে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এক সামুরাইয়ের মৃত্যু ও তার স্ত্রীর ওপর ঘটা সহিংসতার ঘটনাকে ঘিরে চারজনের সাক্ষ্য—ডাকাত তাজোমারু, নিহত সামুরাইয়ের স্ত্রী, মাধ্যমের সাহায্যে কথা বলা সামুরাইয়ের আত্মা এবং এক কাঠুরের বর্ণনা—একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নেয় ‘রাশোমন ইফেক্ট’ ধারণাটি, যা মনোবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কুরোসাওয়া দেখিয়েছেন যে, মানুষ একই ঘটনাকে নিজের স্বার্থ, লজ্জা বা স্মৃতির খাতিরে ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারে। সত্য কি সত্যিই একটাই? এই প্রশ্নটিই ছবিটির মূল চালিকাশক্তি। স্টিভেন স্পিলবার্গ, মার্টিন স্করসেজি ও ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপোলার মতো বিশ্বখ্যাত নির্মাতারা কুরোসাওয়ার কাজের প্রতি তাঁদের গভীর ঋণের কথা স্বীকার করেছেন। জর্জ লুকাসের ‘স্টার ওয়ার্স’-এর অনুপ্রেরণাতেও ছিল কুরোসাওয়ার ‘দ্য হিডেন ফোর্ট্রেস’-এর ছায়া।

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায়ও কুরোসাওয়ার কাজের প্রবল অনুরাগী ছিলেন। ‘রাশোমন’ দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে টানা তিন দিন ছবিটি দেখেছিলেন। কুরোসাওয়াও সত্যজিৎ রায়কে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘রায়ের সিনেমা না দেখা মানে পৃথিবীতে বাস করেও সূর্য বা চাঁদ না দেখা।’

আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে, যখন বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ভুয়া খবরের ভিড়ে সত্য খুঁজে পাওয়া কঠিন, তখন ‘রাশোমন’ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কুরোসাওয়া কোনো চূড়ান্ত উত্তর না দিয়ে প্রশ্নটি দর্শকদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। ৭৬ বছর পরও এই সাদাকালো সিনেমাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের স্মৃতি ও আবেগ সত্যের ব্যাখ্যাকে প্রতিনিয়ত বদলে দিতে পারে। জাপান ফিল্ম ডেটাবেজ, আইএমডিবি ও বিএফআই-এর তথ্য অনুযায়ী, এই চলচ্চিত্রটি আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক অনন্য দলিল হিসেবে টিকে আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চিত্রশিল্পী থেকে বিশ্বমঞ্চের সম্রাট ১৯১০ সালে টোকিওতে জন্ম নেওয়া আকিরা কুরোসাওয়া প্রথম জীবনে চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করলেও সেই শিল্পীসত্তা কখনো তাঁকে ছেড়ে যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে দেখা যায় একজন চিত্রকরের সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি—আলোছায়ার ব্যবহার, চরিত্রের অবস্থান, আবহাওয়ার নাটকীয় প্রয়োগ এবং দৃশ্য নির্মাণের অসাধারণ নান্দনিকতা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দাম্পত্যের টানাপোড়েন, যৌনতা আর অস্বস্তিকর ডিনার পার্টির গল্প। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে তিনি জাপানি ঐতিহ্য, শেক্‌সপিয়ারের নাটক, রুশ সাহিত্য ও পাশ্চাত্য চলচ্চিত্রভাষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে তাঁর সিনেমায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পরীতির এক বিরল মেলবন্ধন দেখা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর নির্মিত ‘সেভেন সামুরাই’, ‘ইকিরু’, ‘ইয়োজিম্বো’, ‘থ্রোন অব ব্লাড’, ‘রান’ ও ‘ড্রিমস’ আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের ক্ল্যাসিক হিসেবে বিবেচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *