আব্দুস সাত্তার সুমন
আমরা তো যৌতুকের কথা বলিনি, করিম ভাই।
কথাটা বলেই লোকটি একটু হাসলেন। তাঁর সামনে বসে থাকা আব্দুল করিম কিছু বললেন না।
লোকটি আবার বললেন,
এলাকার একটা রেওয়াজ আছে। মেয়ের বাবা সাধ্য অনুযায়ী কিছু উপঢৌকন দেন। একটা মোটরসাইকেল হলে ছেলের যাতায়াতে সুবিধা হয়, একটা ফ্রিজ থাকলে সংসারের কাজেও লাগে। আর দু-একটা আসবাবপত্র তো নতুন সংসারে দরকারই হয়।
করিম সাহেব এবারও চুপ করে রইলেন। তাঁর শুকনো ঠোঁট দুটো নড়ল, কিন্তু কোনো কথা বের হলো না।
পাশের ঘরে বসে সব কথা শুনছিল মারিয়াম। কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে ঘরে এসে দাঁড়াল।
চাচা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
লোকটি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
বলো মা।
আমার বাবা যদি এসব দিতে না পারেন, তাহলে কি আপনার ছেলে আমাকে বিয়ে করবে?
প্রশ্নটি শুনে ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। ছেলের বাবা একবার করিম সাহেবের দিকে, একবার মারিয়ামের দিকে তাকালেন।
না, না মা, তুমি ভুল বুঝছ। আমরা তো জোর করছি না। এগুলো উপহার।
মারিয়াম শান্ত গলায় বলল,
উপহার তো মানুষ নিজের ইচ্ছায় দেয়। কিন্তু না দিলে যদি বিয়ে নিয়ে কথা ওঠে, তাহলে সেটা আর উপহার থাকে না, চাচা।
কেউ আর কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর অতিথিরা চলে গেলেন।
সন্ধ্যায় করিম সাহেব বারান্দায় বসে ছিলেন। সামনে পুরোনো একটি চায়ের কাপ। চায়ে অনেক আগেই মাছি বসেছে, কিন্তু তাঁর সেদিকে খেয়াল নেই।
মারিয়াম পাশে এসে বসতেই তিনি বললেন,
তোর বিয়েটা ভালো ঘরে হতে পারত মা।
মারিয়াম চুপ করে রইল।
দোকানটা বিক্রি করে দিলে হয়তো কিছু টাকা হবে। বাকি টাকা কোথাও থেকে ধার করব।
মারিয়াম বাবার দিকে তাকাল।
দোকান বিক্রি করবেন কেন?
তোর জন্য।
আমার বিয়ের জন্য আপনি নিজের দোকান বিক্রি করবেন?
করিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
বাবা তো মেয়ের জন্য অনেক কিছুই করে।
মারিয়াম ধীরে বাবার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
কিন্তু আব্বা, বিয়ে কি এমন একটা জিনিস, যার জন্য আপনাকে সবকিছু বিক্রি করে দিতে হবে?
করিম সাহেব কিছু বললেন না।
মারিয়াম আবার বলল,
আমার বিয়ে হবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু আপনার মাথার ওপর ঋণের বোঝা রেখে আমি সুখী হতে পারব না।
পরদিন বিকেলে রায়হান এল।
সে একাই এসেছে।
দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
চাচা, একটু কথা ছিল।
করিম সাহেব তাকে বসতে বললেন।
রায়হানের চোখে অস্বস্তি স্পষ্ট।
গতকাল যা হয়েছে, সেটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি।
করিম সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
বড়দের ব্যাপার, বাবা। তোমার ভাবার দরকার নেই।
রায়হান মাথা নাড়ল।
না চাচা, আমার ভাবার দরকার আছে। কারণ বিয়েটা আমার।
মারিয়াম তখন ঘরে এল। রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
আমি চাই, আমাদের বিয়েতে কোনো দাবি থাকবে না। আমার পরিবারের কেউ যদি কিছু চায়, তাতেও আমি রাজি নই।
মারিয়াম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
আপনি কি এটা শুধু এখন বলছেন, নাকি বাড়িতে গিয়েও একই কথা বলতে পারবেন?
রায়হান একটু থেমে বলল,
সত্যি কথা বলতে, জানি না। বাড়িতে কথা কাটাকাটি হবে। কিন্তু এবার আর চুপ থাকব না।
বাড়ি ফিরে রায়হান বুঝতে পারল, কথাটা বলা যত সহজ, টিকে থাকা তত সহজ নয়।
চাচা বললেন,
আমাদের বংশে কোনো দিন ছেলে খালি হাতে বিয়ে করেনি।
এক ফুফু বললেন,
লোকজন কী বলবে?
মা বললেন,
তোর বিয়ে নিয়ে আমাদেরও তো একটা সম্মান আছে।
রায়হান মায়ের দিকে তাকাল।
সম্মান কি জিনিসপত্রে, মা?
মা বিরক্ত হয়ে বললেন,
তুই এখন অনেক বড় বড় কথা শিখেছিস।
রায়হান আর তর্ক করল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বলল,
আমার বিয়ে নিয়ে কাউকে ঋণ করতে আমি রাজি নই।
ঘরের সবাই থেমে গেল।
কয়েক দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে গ্রামে আলোচনা চলল। কেউ বলল, রায়হান ঠিক করছে। কেউ বলল, বিয়ের আগে এত কথা ভালো নয়। আবার কেউ কেউ বলল, মেয়েপক্ষ কিছু দিলে ক্ষতি কী?
শুক্রবার জুমার নামাজের পর গ্রামের ইমাম সাহেব বিয়ে সহজ করার বিষয়ে কথা বললেন। তিনি কারও নাম নিলেন না। শুধু বললেন,
আমরা অনেক সময় রেওয়াজের কথা বলে এমন কিছু চাই, যা না দিলে অন্য পক্ষের কষ্ট হয়। বিয়ে যেন কারও জন্য বোঝা না হয়, এ কথাটাও আমাদের মনে রাখা দরকার।
নামাজ শেষে লোকজন বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল।
সেই রাতেই রায়হান মারিয়ামদের বাড়িতে খবর পাঠাল।
আমি বিয়ে করতে চাই। তবে আমার পক্ষ থেকে কোনো কিছু চাওয়া হবে না।
বিয়ের দিন ঠিক হলো।
ছোট্ট জামে মসজিদে বিয়ে হলো। বড় কোনো আয়োজন ছিল না। আত্মীয়স্বজন আর গ্রামের কয়েকজন পরিচিত মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
মহর নির্ধারণ করা হলো। ইজাব-কবুলের পর সবাই দোয়া করল।
বিয়ে শেষে করিম সাহেব রায়হানের হাত ধরে বললেন,
বাবা, আমি ভেবেছিলাম মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে দোকানটাও বিক্রি করতে হবে।
রায়হান একটু অস্বস্তি নিয়ে হেসে বলল,
চাচা, দোকানটা বিক্রি করলে আপনার চলবে কী করে?
করিম সাহেব আর কথা বলতে পারলেন না।
বিয়েটি নিয়ে কিছুদিন গ্রামের মানুষের মধ্যে আলোচনা চলল। কেউ প্রশংসা করল, কেউ আবার বলল,
দেখি, সামনে কী হয়।
কয়েক মাস পর পাশের গ্রামে আরেকটি বিয়ের কথা চলছিল। সেখানে ছেলেপক্ষের একজন এসে বলল,
আমাদের দিক থেকে কিছু লাগবে না। মেয়েটাকে ভালোভাবে দিলেই হবে।
করিম সাহেবের কথা মনে পড়ল।
তিনি সেদিন দোকানে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
এক বিকেলে গ্রামের কয়েকজন তরুণ মসজিদের সামনের পথের পাশে একটি ছোট কাঠের ফলক বসাল। সেখানে লেখা হলো
বিয়েতে দাবি নয়, সম্পর্ক হোক।
ফলকটি নিয়ে কেউ বিশেষ কিছু বলল না। তবে পথ দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই পড়ে দেখত।
একদিন বিকেলে কয়েকজন শিশু সেখানে খেলছিল। একটি ছেলে ফলকের দিকে তাকিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
আব্বা, বিয়েতে কেউ কিছু না দিলেও হয়?
বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
হয় তো। বিয়ে করার জন্য জিনিসপত্রের চেয়ে মানুষটাই বড়।
ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল,
তাহলে সবাই আগে চাইত কেন?
বাবা একটু হেসে বললেন,
সবাই যা করে, তা সব সময় ঠিক হয় না।
দূরে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো।
বাবা ছেলের হাত ধরলেন।
চল, নামাজ পড়ে আসি।
ছেলেটি বাবার সঙ্গে হাঁটতে লাগল। পথের পাশে কাঠের ফলকটি রয়ে গেল।
তাতে লেখা তিনটি শব্দ তখনও দেখা যাচ্ছিল
দাবি নয়, সম্পর্ক।




















