চীন-মার্কিন সম্পর্কের নতুন অবস্থান বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সি চিন পিং - Mati News
Friday, September 25

চীন-মার্কিন সম্পর্কের নতুন অবস্থান বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সি চিন পিং

 

চীন-মার্কিন সম্পর্কের নতুন অবস্থান বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সি চিন পিং

সেপ্টেম্বর ২৬: প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে আরেকবার করমর্দন। বিশ্বের দৃষ্টি আবারও চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দিকে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফর করেন। ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আবারও মুখোমুখি হলেন দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। চীন-মার্কিন সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের বৈঠক ও মতবিনিময় থেকে এসেছে নতুন দিকনির্দেশনা।

বর্তমান বিশ্বে পরিবর্তনের গতি বেড়েছে। ইতিহাসও নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। এমন পরিস্থিতিতে দুটি বৃহৎ দেশ হিসেবে মানবজাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বহন করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটন সফরে সি চিন পিং ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আন্তরিক ও গভীরভাবে মতবিনিময় করেছেন। নতুন অনেক ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। চীন-মার্কিন গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্কের অন্তর্নিহিত বিষয় আরও সমৃদ্ধ করেছেন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন।

হোয়াইট হাউসের প্রথম তলার দেয়ালে আছে গতবছর বুসানে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাৎ এবং এ বছরের মে মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ছবি। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ইতিহাসে যুক্ত হলো হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আয়োজিত স্বাগত অনুষ্ঠানে সি চিন পিংয়ের অংশগ্রহণের নতুন মুহূর্ত।

বিশ্বের দুটি বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই নয়, বিশ্ব পরিস্থিতির গতিপথকেও প্রভাবিত করে।

চলতি বছরের মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের সময় দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান চীন-মার্কিন গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে সম্মত হন। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই নতুন অবস্থানের তাৎপর্য চারটি দিক থেকে ব্যাখ্যা করেছেন—সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইতিবাচক স্থিতিশীলতা, প্রতিযোগিতা সীমিত রেখে সুস্থ স্থিতিশীলতা, মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তিকে প্রত্যাশাযোগ্য করে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা।

এই নতুন অবস্থান একদিকে চীন-মার্কিন সম্পর্কের বাস্তবতা প্রতিফলিত করে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রত্যাশাও তুলে ধরে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ।

হোয়াইট হাউসের স্বাগত অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে যোগাযোগ জোরদার, আন্তরিক সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে চীন-মার্কিন গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দিকনির্দেশনা দেন সি চিন পিং।

স্থানীয় সময় ২৫ সেপ্টেম্বর সকালে সি চিন পিং ও তার স্ত্রী ফেং লি ইউয়ান হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে চা-চক্রে অংশ নেন। সেখানে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান চীন-মার্কিন সম্পর্কের অবস্থানের অন্তর্নিহিত বিষয় আরও সমৃদ্ধ করা এবং যৌথভাবে ‘সম্মান, ন্যায্যতা ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্মত হন।

চীন-মার্কিন সম্পর্ক দুই দেশের ১৭০ কোটিরও বেশি মানুষের কল্যাণের সঙ্গে জড়িত। একইসঙ্গে এর প্রভাব বিশ্বের ৮০০ কোটিরও বেশি মানুষের স্বার্থের ওপরও পড়ে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সি চিন পিংয়ের অবস্থান তাই স্পষ্ট—চীনা জাতির মহান পুনরুত্থান বাস্তবায়ন এবং ‘আমেরিকাকে আবার মহান করা’—এই দুই লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, একে অপরকে এগিয়ে নিতে পারে এবং বিশ্বে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।

সম্প্রতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দল নতুন দফার আলোচনা করেছে এবং একটি নতুন যৌথ ব্যবস্থা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এটি দুই দেশের শিল্পখাত, সাধারণ মানুষ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত। চীন-মার্কিন সহযোগিতা বিশ্বের সব সমস্যার সমাধান করতে না পারলেও দুই দেশের সহযোগিতা ছাড়া বিশ্বের অনেক সমস্যার সমাধান করা কঠিন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় সি চিন পিং বলেন, ‘সহযোগিতা একটি দ্বিমুখী পথ। চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতার তালিকা বাড়ানোর পাশাপাশি সমস্যার তালিকাও কমাতে হবে।’

সি চিন পিং আরও বলেন, সমতা, সম্মান ও পারস্পরিক সুবিধার চেতনা বজায় রাখলে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই পক্ষ একে অপরের দিকে এগিয়ে আসবে, পারস্পরিক সুবিধা ও উভয়ের জন্য কল্যাণকর সহযোগিতার দিকনির্দেশনা বজায় রাখবে এবং চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের টেকসই ও স্থিতিশীল উন্নয়ন এগিয়ে নেবে।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্যের মোট মূল্য ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। মার্কিন-চীন বাণিজ্য জাতীয় কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ শতাংশ মার্কিন কোম্পানি চীনে মুনাফা করেছে। ৯৫ শতাংশ কোম্পানি মনে করে, চীনে তাদের ব্যবসা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে। বাজার থেকে পাওয়া এসব ইতিবাচক সংকেত চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার পারস্পরিক সুবিধার বাস্তব চিত্রই তুলে ধরে।

নতুন প্রযুক্তি-বিপ্লব দ্রুত এগিয়ে চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা ও ঝুঁকি একইসঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি পুরো মানবজাতির সামনে নতুন এক প্রশ্নও হাজির করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় সি চিন পিং বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে বড় শক্তি। দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, তবে আরও বেশি সহযোগিতা হতে পারে। এক্ষেত্রে সক্ষমতা প্রদর্শন করা উচিত, একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়।’

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগ ও সংলাপ জোরদার করা, ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও উন্নত ও কল্যাণমুখী পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া—এগুলো দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ঐকমত্য বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে তৈরি হতে পারে বৈশ্বিক ডিজিটাল শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

২০ বছরেরও বেশি আগে রোনাল্ড সাকোলস্কি নামের এক মার্কিন নাগরিক চীনের মরুকরণ প্রতিরোধকর্মী ইন ইয়ু চেনকে গাছ লাগাতে সহায়তা করেছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি আবার চীনে ফিরে এসে দেখেছেন, যে মরুভূমিতে একসময় গাছ লাগানো হয়েছিল, সেটি এখন সবুজ বনে পরিণত হয়েছে।

‘এই গল্প অনেক চীনা জনগণকে মুগ্ধ করেছে এবং এটি চীন-মার্কিন দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ আদানপ্রদানের একটি উদাহরণ।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আয়োজিত স্বাগত ভোজে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করেন, মানবিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও বোঝাপড়া বাড়াতে এবং চীন-মার্কিন বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার জনভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক।

দুই দেশের মানুষের যোগাযোগের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—কুলিংয়ের প্রেমকাহিনি থেকে ‘ফ্লাইং টাইগার্স’-এর বন্ধুত্ব, আর ‘পিংপং কূটনীতি’ থেকে বরফ গলানোর সূচনা—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব সবসময়ই জনগণের মধ্যে শিকড় গেড়েছে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।

২০২৩ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে দেওয়া ভাষণে সি চিন পিং ঘোষণা করেছিলেন, ‘চীন আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার মার্কিন তরুণ-তরুণীকে চীনে সফর ও পড়াশোনার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে ইচ্ছুক।’

এই উদ্যোগ নির্ধারিত সময়ের দুই বছরেরও বেশি আগে লক্ষ্য পূরণ করেছে। চীন সফরকারী মার্কিন তরুণ-তরুণীরা বলেছেন, ‘চীনের স্বাদ, স্পর্শ, গন্ধ এবং দৃশ্যপট; সব একসঙ্গে একটি মনোমুগ্ধকর ছবি তৈরি করেছে।’

তবে তারা শুধু সেই ছবি নয়, নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বকে দেখার বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিও অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান।

এবার হোয়াইট হাউসের স্বাগত অনুষ্ঠানে সি চিন পিং ঘোষণা করেন, আগামী পাঁচ বছরে চীন আরও এক লাখ মার্কিন তরুণ-তরুণীকে চীনে সফর ও পড়াশোনার আমন্ত্রণ জানাবে।

এই নতুন উদ্যোগ দুই দেশের তরুণদের পারস্পরিক শিক্ষা ও বিনিময়ের আরও সুযোগ তৈরি করবে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের নতুন সেতু নির্মাণ করবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ হাত মিলিয়ে এগিয়ে যাবে এবং বন্ধুত্বের সুন্দর ফুলটিকে আরও যত্নে লালন করবে।

বেইজিং থেকে ওয়াশিংটন, নিঃসন্দেহে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে এই ‘দ্বিমুখী যাত্রা’ চীন-মার্কিন সম্পর্কের ইতিহাসে যোগ করেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সবার বিশ্বাস—রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতির কৌশলগত নেতৃত্বে চীন-মার্কিন গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্কের অন্তর্নিহিত বিষয় প্রতিনিয়ত আরও সমৃদ্ধ হবে। পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত বিশ্বে যে সম্পর্ক যোগাবে স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক শক্তি।

(স্বর্ণা/ফয়সল/আনন্দী)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *