রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং স্থানীয় বখাটে মাদকসেবীদের বেপরোয়া আচরণ, ছাদে মাদক সেবনে বাধা প্রদান এবং চাঁদা না দেওয়ার জের ধরেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। সরেজমিন অনুসন্ধান, স্থানীয়দের সাক্ষ্য এবং পুলিশের তদন্তে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে (১২) মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। তার মেয়ে প্রার্থী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং ছেলে প্রিয়ম জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ঘটনার রাতেই মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এলাকাবাসীর তথ্যমতে, মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া ও দাসপাড়ার প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী। এলাকায় একাধিক মন্দির ও মঠ থাকলেও সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এলাকায় মাদক সেবন ও চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা প্রায়ই গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে উঠে নেশা করত। শিক্ষক বারবার নিষেধ করায় এবং বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের শত্রুতা তৈরি হয়।
তদন্তের স্বার্থে পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসা থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। প্রতিবেশী ব্যাংকার বিপ্লব কুমার ও রামনাথ দাসের বাসার ফুটেজও পুলিশের হাতে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জবা রানী ও পল্লবী রানী জানান, অভিযুক্তরা তাদের প্রতিবেশী এবং তারা বিভিন্ন দোকানে কাজ করার আড়ালে মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ জানান, মাদকের কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে, যা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বপ্রণোদিত হয়ে জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসা থেকে লুট করা স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস দাবি করেছেন, তার ছেলে মাদক সেবন করত কি না তা তার জানা নেই।
রংপুর মেট্রো পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, আসামিরা কোনো চাপ ছাড়াই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। বর্তমানে ডিবি পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত হোসেন মামলাটি তদন্ত করছেন। তিনি আরও জানান, ঢাকা থেকে আসা হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের প্রকৃত ঘটনা জানানো হয়েছে এবং তারা পুলিশের তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোমবার রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও শোক র্যালি করেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, সীমান্তবর্তী চোরাপথ দিয়ে আসা মাদকের সহজলভ্যতা এই এলাকার পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে, যার বলি হতে হয়েছে একটি নিরপরাধ পরিবারকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রংপুরের সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের ৪ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কারণ ছিল না; বরং ছাদে মাদক সেবনে বাধা এবং চাঁদা না দেওয়াই ছিল এ ঘটনার মূল অনুঘটক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয়দের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, পুলিশের অনড় অবস্থান এবং আদালতে গ্রেপ্তার দুই আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে এটা অনেকটাই পরিষ্কার যে, স্থানীয় বখাটে মাদকসেবীদের বেপরোয়া আচরণের বলি হতে হয়েছে নিরপরাধ এই পরিবারটিকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নজরদারির অভাব ও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির সুযোগ নিয়ে ওই এলাকার বখাটে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে গণপতি চক্রবর্তীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রংপুর নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে অন্যতম হলো মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া ও দাসপাড়া। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানকার ৯৫ শতাংশ অধিবাসীই সনাতন ধর্মাবলম্বীর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ এলাকায় শ্রীশ্রীপ্রভু জগদ্বন্ধু সেবাশ্রম নামে একটি মঠসহ মাসুয়াপাড়া কালীমন্দির, বৈরাগীপাড়া কালীমন্দিরসহ ছোট-বড় কয়েকটি মন্দির রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক কোনো অজুহাতের বিষয় পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ বিষয়ে নিহত গণপতি মাস্টারের প্রতিবেশী ব্যাংকার বিপ্লব কুমার ও রামনাথ দাসের বাসায় গেলে তারা সিসি ফুটেজের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।




















