চলতি মৌসুমে দেশের ১৭৩টি চা বাগানে সবুজ পাতার সমারোহে রেকর্ড উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত আগাম বৃষ্টিপাত, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং চা বোর্ডের নিয়মিত তদারকির ফলে চা উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য আসছে। জুলাই মাস পর্যন্ত দেশে মোট ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি বেশি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৌলভীবাজারের ৯২টি বাগানসহ দেশের সবকটি বাগানে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার শুরু থেকেই বাগানে ভালো মানের পাতা পাওয়া যাচ্ছে। চা শ্রমিক বিনা বাউরী, স্বপ্না দোসাদ ও স্বপ্না মুন্ডা জানান, আগাম বৃষ্টির কারণে পাতা ভালো আসায় তারা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পাতা তুলতে পারছেন। বাগানভেদে প্রতি কেজি অতিরিক্ত পাতার জন্য চার থেকে পাঁচ টাকা বাড়তি পাওয়ায় শ্রমিকদের আয়ও বেড়েছে। শ্রমিক সর্দার লক্ষন মাদ্রাজী, শ্যামল ভৌমিক ও আব্দুল আহাদ জানান, পাতা ভালো হওয়ায় শ্রমিকরা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, তবে তাদের অন্যান্য ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করাও জরুরি।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ২৭ হাজার কেজি। এর আগের বছর ২০২৪ সালে ১০ কোটি ৮০ লাখ কেজি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজি। বর্তমান উৎপাদন হার বলছে, দেশ চা উৎপাদনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এগিয়ে আছে।
উৎপাদনের পাশাপাশি নিলামেও চায়ের বিক্রি বেড়েছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে ৩ কোটি ২৭ লাখ ৮১৩ কেজি চা বিক্রি হয়েছে, যার গড় মূল্য কেজিপ্রতি ২৭৫ টাকা। একই সময়ে শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ২১৩ কেজি চা বিক্রি হয়েছে ২৬০ টাকা গড় মূল্যে এবং পঞ্চগড় নিলাম কেন্দ্রে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কেজি চা বিক্রি হয়েছে প্রায় ২৫২ টাকা গড় মূল্যে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মোট ৯ কোটি ৬ লাখ ৭২ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়েছে, যার গড় মূল্য ২৪৫ টাকা।
রপ্তানির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয়েছিল ৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৯ লাখ ৮০ হাজার কেজিতে পৌঁছায় এবং আয় হয় ৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ লাখ ৮০ হাজার কেজি রপ্তানি থেকে ১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৯০ হাজার কেজি রপ্তানি করে ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা আয় হয়েছে।
তবে উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও চা শিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচ। বাংলাদেশীয় চা সংসদ, ধলই ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান ও পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক ইউসুফ খান জানান, বিদ্যুৎ, সার, তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু নিলামে সেই অনুপাতে দাম না পাওয়ায় বাগান মালিকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
শ্রমিক নেতারাও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। শমসেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েত নেতা গোপাল কানু বলেন, বাগানের লাভের হিসাব শ্রমিকদের জানানো হয় না। অনেক শ্রমিকের বকেয়া পাওনা রয়েছে এবং বেশ কিছু বাগান বন্ধ রয়েছে। নিলামে ভালো দাম পাওয়া গেলে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ ও বন্ধ বাগানগুলো চালুর দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশীয় চা সংসদ, সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা শিবলী জানান, আবহাওয়া ও বোর্ডের তদারকির পাশাপাশি বাগান মালিকদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। চা বোর্ডের উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক ড. একেএম রফিকুল হক বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় উৎপাদন, নিলাম ও রপ্তানিতে ইতিবাচক ফল আসছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের চারা রোপণ ও নিয়মিত তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি বাড়াতে সরকার কাজ করছে। চায়ের গুণগত মান বজায় রাখতে পারলে দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পাওয়া সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া, সঠিক ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিলামে ন্যায্য দাম—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে দেশের চা শিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে অনেক শ্রমিক ৪০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পাতা সংগ্রহ করতে পারছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত বছরের একই সময়ে উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার কেজি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা জানান, উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও এর সুফল শ্রমিকদের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা তারা জানতে পারেন না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে উৎপাদন বাড়লেও বাড়তি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পাওয়ায় শঙ্কায় পড়েছেন বাগান মালিকরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবার কখনো সর্দারের ডাকে ওজন দিতে ছুটে আসছেন চা-চয়নকারীরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে হাজিরার পাশাপাশি বাড়তি আয়ও হচ্ছে তাদের।




















