ইনফিনিটির রহস্যভেদ: পল কোহেনের সেই সাহসী গাণিতিক প্রমাণ ও ফিল্ডস মেডেল জয় - Mati News
Thursday, August 27

ইনফিনিটির রহস্যভেদ: পল কোহেনের সেই সাহসী গাণিতিক প্রমাণ ও ফিল্ডস মেডেল জয়

১৮৭৪ সালে জার্মান গণিতবিদ জর্জ ক্যান্টর যখন প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেন যে সব ‘অনন্ত’ বা ইনফিনিটি সমান নয়, তখন তা গণিত বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি দেখান যে, স্বাভাবিক সংখ্যার (১, ২, ৩…) ইনফিনিটির তুলনায় বাস্তব সংখ্যার (যেমন √২, π, e) ইনফিনিটি অনেক বড়। এই আবিষ্কারের পর ক্যান্টর একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন—এই দুই আকারের ইনফিনিটির মাঝে কি অন্য কোনো সাইজের ইনফিনিটি থাকা সম্ভব? তিনি বিশ্বাস করতেন এমন কিছু নেই, যা গণিতের ইতিহাসে ‘কন্টিনাম হাইপোথিসিস’ (Continuum Hypothesis) নামে পরিচিত। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্বের সেরা গণিতবিদেরা এই ধাঁধার কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি।

অবশেষে ১৯৬৩ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সী তরুণ গণিতবিদ পল কোহেন এমন এক সমাধান নিয়ে আসেন, যা লজিকের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়। তাঁর এই অভাবনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৬ সালে ৩২ বছর বয়সে তাঁকে গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফিল্ডস মেডেল’ প্রদান করা হয়। জ্যামিতি বা বীজগণিতের মতো সেট থিওরিও ZFC (Zermelo-Fraenkel Set Theory with the Axiom of Choice) নামক কিছু মৌলিক স্বতঃসিদ্ধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গণিতবিদেরা দীর্ঘকাল ধরে মনে করতেন, এই নিয়মগুলো ব্যবহার করে কন্টিনাম হাইপোথিসিসকে হয় সত্য, নয়তো মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব।

১৯৪০ সালে কার্ট গোডেল প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রচলিত জেএফসি নিয়ম দিয়ে কন্টিনাম হাইপোথিসিসকে ভুল প্রমাণ করা অসম্ভব। এর বিপরীতে পল কোহেন ১৯৬৩ সালে প্রমাণ করেন যে, একই নিয়ম ব্যবহার করে একে সঠিক প্রমাণ করাও অসম্ভব। অর্থাৎ, কন্টিনাম হাইপোথিসিস গণিতের ইতিহাসের এমন একটি সমস্যা যা সম্পূর্ণ স্বাধীন। একে সত্য বা মিথ্যা—যেকোনোটি ধরে নিলেও গাণিতিক কাঠামোতে কোনো বৈপরীত্য তৈরি হয় না।

কোহেনের তাসের টেক্কা: ‘ফোর্সিং’ (Forcing) পদ্ধতি

  • নতুন গাণিতিক হাতিয়ারএই অসম্ভবকে সম্ভব করতে কোহেন সেট থিওরিতে ‘ফোর্সিং’ নামক সম্পূর্ণ নতুন এক গাণিতিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
  • গোডেলের মডেলের ব্যবহার১৯৪০ সালে কার্ট গোডেল ‘কনস্ট্রাক্টিবল ইউনিভার্স’ (L) নামে সেট থিওরির যে মডেল তৈরি করেছিলেন, যেখানে কন্টিনাম হাইপোথিসিস সত্যি ছিল, কোহেন সেখান থেকেই তাঁর গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করেন।
  • কৌশলগত সংযোজন‘ফোর্সিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি বাইরের কিছু নতুন উপাদান বা সেট (Generic Filters) কৌশলগতভাবে ওই মডেলের ভেতর প্রবেশ করান।
  • ভারসাম্য পরিবর্তননতুন উপাদানগুলো যুক্ত হওয়ার ফলে মডেলটি প্রসারিত হয় এবং কোহেন এমনভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করেন যাতে স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে বাস্তব সংখ্যার ইনফিনিটি অনেক বড় হয়ে যায়, যার মাঝে নতুন সাইজের ইনফিনিটি তৈরি হয়।

ফিল্ডস মেডেল অর্জনের পেছনে মূল কারণ

  • হিলবার্টের ১ নম্বর সমস্যার সমাধান১৯০০ সালে ডেভিড হিলবার্টের দেওয়া শতাব্দীর সেরা ২৩টি গাণিতিক সমস্যার তালিকার শীর্ষে ছিল এই কন্টিনাম হাইপোথিসিস, যার চূড়ান্ত সমাধান কোহেন প্রদান করেন।
  • যুক্তিবিদ্যার নতুন দিগন্ত‘ফোর্সিং’ পদ্ধতি আবিষ্কারের পর গাণিতিক যুক্তিশাস্ত্রে বিপ্লব ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে এই কৌশল ব্যবহার করে আরও শত শত অমীমাংসিত সমস্যার স্বাধীনতা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।
  • বিশ্লেষণ থেকে লজিকে চমককোহেন মূলত সেট থিওরির গবেষক ছিলেন না, বরং তাঁর মূল ক্ষেত্র ছিল গাণিতিক বিশ্লেষণ। বাইরের একজন হয়েও মাত্র কয়েক মাসের চেষ্টায় লজিকের এই চিরন্তন রহস্যভেদ করা ছিল এক অবিশ্বাস্য কীর্তি।

পল কোহেনের এই প্রমাণ আমাদের শেখায় যে, গণিত কোনো স্থবির বা পরম সত্যের খাঁচায় বন্দী বিষয় নয়। মানুষের চিন্তার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গণিতের সীমানাও প্রসারিত হয়। ইনফিনিটিকে স্পর্শ করা না গেলেও, তাকে বোঝার অনন্য ক্ষমতা যে মানুষের মস্তিষ্কের আছে, পল কোহেন সেটিই প্রমাণ করে গেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৯৬৬ সালে মস্কো ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেসে পল কোহেনকে ফিল্ডস মেডেল দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *