উন্নয়নের চীন দর্শন: মর্যাদাপূর্ণ জীবনই মোক্ষ - Mati News
Monday, October 12

উন্নয়নের চীন দর্শন: মর্যাদাপূর্ণ জীবনই মোক্ষ

ফয়সল আবদুল্লাহ

একটি দেশের উন্নয়নে সবার আগে কী দরকার? সোজাসাপটা উত্তর হলো, মানুষের উন্নয়ন। দেশের জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারে সেই রাষ্ট্র কখনই বড় বড় অবকাঠামো বা আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যানকে উন্নয়নের মাপকাঠি দাবি করতে পারে না। একটি বিপুল জনগোষ্ঠীকে কর্মহীন ও দারিদ্র্যপীড়িত রেখে কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠালে রাষ্ট্র উন্নত হয় না। মানুষের জীবিকা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত না করে স্রেফ মুখরক্ষার জন্য বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেই কি উন্নয়নের দাবি করা যায়?

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের উন্নয়ন করতে গেলে এখন কী দরকার? সীমিত সম্পদ দিয়ে সব মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব? চীনের দিকে তাকালে প্রশ্নটার উত্তর মিলতে পারে।

কেবল মাত্র একটি বিষয় নিশ্চিত করেই চীন পৌঁছে গেছে উন্নতির শিখরে। তা হলো সুশাসন। প্রতিষ্ঠার পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি দারিদ্র্য বিমোচনের সংজ্ঞাটা ঠিক করেছে আগে, তারপর সেই অনুযায়ী স্থির রেখেছে নিজেদের লক্ষ্য, নিয়েছে দ্রুত ও সময়োপযোগী সব নীতি।

এই দারিদ্র্য বিমোচন বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশটি অন্যান্য পশ্চিম বা প্রাচ্যের উন্নত দেশের ইতিবাচক কৌশলগুলো থেকে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে সত্য, কিন্তু কোনো একটি কাঠামোকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেনি। চীনের ভৌগলিক কাঠামো, জনগণ এবং সর্বোপরি এই ভূখণ্ডের হাজার হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে তবেই দারিদ্র বিমোচনের কর্মপ্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে চীন।

এ প্রসঙ্গে আমরা অন্য অনেক দেশের মানুষের মনোজগতে উন্নয়ন বা উচ্চশিক্ষা নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণার কথা বলতে পারি। যেমন কারও কারও দৃষ্টিতে উন্নয়ন মানেই পাশ্চাত্যায়ন কিংবা ইংরেজি বলতে পারা মানেই ওই ব্যক্তি উচ্চশিক্ষিত। কেউ পশ্চিমাদের মতো পোশাক বা সংস্কৃতি অনুসরণ করলেই ধরে নেওয়া হয়, সে হয়তো উন্নত বা সভ্য জনগোষ্ঠীর অংশ।

দুয়েকজন হয়তো ব্যতিক্রম। তবে সামষ্টিকভাবে এমন চিন্তাভাবনার একটি নেতিবাচক প্রভাব কিন্তু রয়েছে। কেননা, এমন অবস্থায় জনগণের জীবনমানের সত্যিকার উন্নয়নে কী কী জরুরি, সেই প্রশ্ন কিন্তু আড়ালেই থেকে যায়। উন্নয়নের ধারণাটি তখন আর জনগণকেন্দ্রিক থাকে না। মানুষের মনোজগতে ‘আগে থেকে ঠিক করা’ কিছু সূচকের কাছেই বারবার নতিস্বীকার করে উন্নয়নের ধারণা। তখন তাদের মনে উন্নয়ন বলতে হয়তো নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোর ছবিই ভেসে উঠবে, সেটা হতে পারে একটি সেতু কিংবা একটি শহরের মাঝে কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা বড় কোনো ভবন বা কারখানা।

আবার কেউ কেউ তো উন্নয়ন বলতে দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বড় কিছু শিল্প-প্রতিষ্ঠানকেও বুঝে থাকেন। কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারেন না যে, একটি দরিদ্রপীড়িত দেশে একটি ছোট গোষ্ঠীর জন্য একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলা মানেই সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি নয়; কিংবা দরিদ্র দেশের এক শতাংশ জনগণ কোটিপতি হয়ে গেলেই কিন্তু দেশ উন্নত হয় না।

চীনের প্রশাসনের উন্নয়নের ধারণা প্রথাগত এসব ধারণার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। এটি কারও অনুকরণে তৈরি হয়নি। তাই একে বলা হয় চীনা শৈলীর উন্নয়ন। দেশের যত সম্পদ আছে তা সুষ্ঠুভাবে মানুষের জীবনমান উন্নত করছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করা হয় এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায়। একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বা স্রেফ বিশ্বকে দেখানোর জন্য বড় বড় কাঠামো তৈরি করা হয় না উন্নয়নের এই চীনা মানদণ্ডে।

জনগণের জীবনমানকে উন্নয়নের কেন্দ্রে রেখে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা, ধাপে ধাপে সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে চীন দেখিয়েছে—উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, মানুষের জীবনকে মর্যাদাপূর্ণ করে তোলার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।

চীনের এ ধারণা অন্যদের জন্য হুবহু নকশা বা মডেল নাও হতে পারে। তবে এর পেছনের নীতিগুলো একই ধরনের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দেশগুলোর জন্য মূল্যবান শিক্ষা দিতে পারে।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার শুরুর বছরগুলোতে অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো ছিল সরল— উৎপাদন পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাই ছিল দেশ শাসনের লক্ষ্য ।

বিশেষ করে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি চালুর পর দারিদ্র্য বিমোচন হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় লক্ষ্য।

কয়েক দশক ধরে পরিচালিত বৃহৎ পরিসরের চীনা শৈলীতে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির কল্যাণে চীনের গ্রামীণ এলাকার জীবনযাত্রার ব্যাপক পরিবর্তনও ঘটে। এর পরিষ্কার উদাহরণ বিশ্বের চোখের সামনেই—

২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত, চীনে ৯ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার গ্রামীণ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা হয়। একই সময়ে, দারিদ্র্যপীড়িত হিসেবে চিহ্নিত ৮৩২টি কাউন্টি চরম দারিদ্র থেকে বেরিয়ে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটির লক্ষ্য ‘অভিন্ন সমৃদ্ধি’র দিকে এগিয়েছে—যে ধারণা বিদেশে প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়।

এর অর্থ কিন্তু একেবারে শতভাগ সমতা প্রতিষ্ঠা নয়। বা এর অর্থ এটাও নয় যে, সবাই একযোগে ধনী হয়ে যাবে। বরং এর লক্ষ্য হলো প্রবৃদ্ধির সুফল যেন আরও ব্যাপকভাবে ভাগাভাগি হয়, একই সঙ্গে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উদ্যোগ ও উৎপাদনশীলতার প্রেরণা বজায় থাকে।

অভিন্ন সমৃদ্ধির গুরুত্ব নিহিত রয়েছে এর পেছনে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায়। এক্ষেত্রে আমরা চীনা শৈলীর বণ্টন পদ্ধতির কথা বলতে পারি। এই বণ্টন হয়ে থাকে তিনটি স্তরে।

প্রাথমিক বণ্টন বাজার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, কর, সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা কমাতে পারে বৈষম্য। তৃতীয় স্তরে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক উন্নয়নে সহায়তার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের মানুষদের স্বেচ্ছামূলক অবদান। এই ব্যবস্থাটির তদারকি, নীতি নির্ধারণ ও আইনি কাঠামো তৈরির দায়িত্বটা নিতে হবে সরকারকেই।

আবার এই বণ্টনের পাশাপাশি মৌলিক জনসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চীনে বাধ্যতামূলক শিক্ষায় অর্থায়ন, ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষের চিকিৎসা বীমা সুবিধা এবং প্রায় সব নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করা পেনশন ব্যবস্থার ফলে যা ঘটেছে তা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরাসরি মানুষের জীবনের বাস্তব উন্নতি এনে দিয়েছে।

আবার সেই সঙ্গে আঞ্চলিক উন্নয়ন কৌশল ও গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির মাধ্যমে ভৌগোলিক বৈষম্যটাও কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এটা কেউ বলতে পারবে না যে, চীনের উন্নয়ন কেবল শহর বা কেবল গ্রামমুখী। কিংবা এও বলা যাবে না যে, উন্নয়ন হয়েছে কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রদেশে।

অভিন্ন এ সমৃদ্ধির কিছু পরীক্ষামূলক প্রদর্শন অঞ্চল আছে। এতে চেচিয়াং প্রদেশের অভিজ্ঞতা একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। গ্রাম পর্যায়ের সমষ্টিগত অর্থনীতি শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে চেচিয়াং নির্ধারিত সময়ের আগেই শহর ও গ্রামের আয়ের ব্যবধান কমিয়েছে।

দারিদ্র দূরীকরণ বা উন্নয়ন যেটাই বলা হোক না কেন, চীনের অভিজ্ঞতার প্রাসঙ্গিকতা নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের মধ্যে থাকে না, এটি থাকে নীতির পেছনে থাকা নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে।

প্রথমত, জীবনযাত্রার মানে দীর্ঘস্থায়ী উন্নতির জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। এরপর দরকার কার্যকর রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা। অনেক উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক অগ্রগতি শুধু সম্পদের স্বল্পতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয় না; বরং সেই সম্পদকে কাজে লাগানো বা দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নের সীমিত সক্ষমতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সীমিত সম্পদ দিয়ে জনগণের জীবনমান কেন্দ্রিক উন্নয়ন চাইলে, আগে সুশাসন ও নীতিতে অটল থাকার মতো একটি জনবান্ধব শাসন ব্যবস্থাই দরকার।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং থেকে।

dhrubonil@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *