Friday, July 19
Shadow

বিজ্ঞানের খবর : ফিউশনে নতুন সাফল্য

গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটি (এনআইএফ) ঘোষণা করেছে, প্রথমবারের মতো ১৯২টি লেজার দিয়ে একটি ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও কার্বন ফুটপ্রিন্ট ছাড়াই গ্রিডে বিদুৎ আনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংস্থা চালিয়ে আসছে বড় মাপের গবেষণা। তাদের লক্ষ্য ছিল এমনই একটা যন্ত্র তৈরির, যেখানে ন্যূনতম জ্বালানিতে মিলবে নিরবচ্ছিন্ন ও শতভাগ বিশুদ্ধ বিদ্যুৎ। তবে সাম্প্রতিক সাফল্যের পরও বিজ্ঞানীরা বলছেন, ফিউশন শক্তির সত্যিকারের অগ্রগতি পেতে আরও কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। আবার এখনো এটা পরিষ্কার নয় যে, ফিউশন শক্তি আমাদের পাওয়ার গ্রিড ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মতো আদৌ সাশ্রয়ী হবে কিনা।

ফিউশন রিয়েক্টর

অল্পকথায় ফিউশন-ফিশন

ফিউশন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে দুটি হালকা নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে। এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি নির্গত হয়, যা সূর্যের ভেতর প্রতিনিয়ত ঘটছে। এখনকার নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলো মূলত ফিশন বিক্রিয়া নির্ভর। এতে ফিউশনের বিপরীত ঘটনা ঘটে। ফিশন প্রক্রিয়ায় ভারী কণা ইউরেনিয়াম ভেঙে হালকা কণায় পরিণত হয়। এ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় শক্তি। যখন এটা এক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে, তখন সেটা হয়ে যায় পারমাণবিক বোমা। আর নিয়ন্ত্রিত উপায়ে শক্তি নির্গত হলে সেটা হয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

পৃথিবীতে ফিউশন ঘটানো কঠিন। পারমাণবিক নিউক্লিয়াস ধনাত্মক চার্জযুক্ত এবং একে অন্যকে বিকর্ষণ করে; কিন্তু সূর্যের বিশাল ভর এমন চাপ তৈরি করে যাতে, ইলেকট্রন ও প্রোটন আলাদা হয়ে পদার্থের অতি উচ্চতাপের দশা প্লাজমা তৈরি হয়। এ অবস্থায় ফিউশন বিক্রিয়াটা সহজে ঘটতে পারে।

আবার ফিউশনের জন্য সাধারণত জড়তা কনফাইনমেন্ট এবং ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট চৌম্বকীয় আবদ্ধতা নামক দুই ধরনের পন্থা রয়েছে। জড়তা পদ্ধতিতে লেজার দিয়ে একটা গোলাকার সিলিন্ডার আকৃতির বস্তুকে প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করা হয়, যা একটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফিউশন জ্বালানিকে ঘনীভূত করে। এই পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়েছিল এনআইএফের লরেন্স লিভারমোর পরীক্ষাকেন্দ্রে। বাকি সংস্থাগুলো ব্যবহার করছে ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট পদ্ধতি। এটা একটি চৌম্বকীয় জেলখানার মতো। যেখানে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চৌম্বক ক্ষেত্র থাকে। যে বলয় থেকে ফিউশনের জ্বালানি ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম (হাইড্রোজেনের ভারী সংস্করণ) কণাগুলো বের হতে পারে না। এমনকি এগুলো রিয়েক্টরের দেয়ালেও আঘাত করতে পারে না। অনেক ডোনাটের মতো রিং আকৃতির এই চৌম্বক বলয়টি একটি আবদ্ধ লুপের মতো কাজ করে।

এনআইএফের সাফল্য

সাধারণত ফিউশন বিক্রিয়ায় গবেষকরা ইংরেজি ‘কিউ’ অক্ষর দিয়ে ইনপুট ও আউটপুটের অনুপাত বুঝিয়ে থাকেন। এই প্রথমবার একটি ফিউশন বিক্রিয়ায় গবেষকরা লক্ষ করেছেন কিউ এর মান ১ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ কার্যকর জ্বালানি আউটপুট বেশি পাওয়া গেছে। তবে এ শক্তিকে ব্যবহার উপযোগী করতে কিউ এর মান ১০-এ পৌঁছাতে হবে। গবেষকদের আশা, কয়েক দশকের মধ্যে আমরা এই সীমায় পৌঁছে যাব।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী লেজার সিস্টেম তৈরি করেছে এনআইএফ। ক্যালিফোর্নিয়ার লিভারমোরের এ গবেষণাগারের দৈর্ঘ্য একটি মাঠের সমান। ১৯২টি শক্তিশালী ইনফ্রারেড লেজার ব্যবহার করে এখানে ফিউশন প্রক্রিয়া চালু (ট্রিগার) করা হয়। যার সম্মিলিত শক্তি ৪ মেগাজুল। আর ওই বিপুল পরিমাণ শক্তি আঘাত করে ফিউশনের জ্বালানি থাকা একটি ক্ষুদ্র গোলাকার বলে। এতে ওই জ্বালানির বাইরের স্তরটি বিস্ফোরিত হয় ও অভ্যন্তরীণ অংশ সংকুচিত হয়ে ফিউশন প্রক্রিয়া চালু করে। এই প্রক্রিয়ায় জ্বালানি ফুরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে। নক্ষত্রের ভেতর ঠিক এমনটাই ঘটে থাকে প্রতিনিয়ত। আমাদের সূর্যের হাইড্রোজেন কণাগুলো এভাবে হিলিয়ামে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং হাইড্রোজেন (জ্বালানি) ফুরিয়ে গেলে সূর্যের তাপ-আলোও ফুরিয়ে আসবে। তবে সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোর ভেতর মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে আগে থেকেই হাইড্রোজের পরমাণুগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে প্লাজমা হয়ে থাকে বলে নতুন করে অতি উচ্চতাপ তৈরি করতে হয় না।

এই ফিউশন কাজ করবে?

এখনো এ নিয়ে খুব বেশি আশা দেখা যাচ্ছে না। কারণ বেশিরভাগ বাণিজ্যিক শক্তি প্রকল্পগুলো এনআইএফ-এর লেজার ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার না করে ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট ব্যবহার করছে। আবার এনআইএফকে মূলত সাড়ে তিনশ কোটি ডলারের অর্থায়ন করা হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণার জন্য, কম খরচে গ্রিডের জন্য শক্তি উৎপাদনের জন্য নয়। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উইলসন রিক্স এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ‘ভবিষ্যৎ ফিউশন প্লান্টগুলো এনআইএফ-এর মতো হবে তা আশা করবেন না। এনআইএফ-এর লেজারগুলো থেকে ফিউশন প্রক্রিয়ায় শক্তি তৈরির নকশাটি বাস্তবসম্মত নয়। সেই তুলনায়, চৌম্বকীয় কনফাইনমেন্টে ফিউশন কিছুটা বাস্তবতা আছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please disable your adblocker or whitelist this site!

error: Content is protected !!