পৃথিবীতে শুরু হওয়া কোনো বড় আকারের সামরিক সংঘাত ভবিষ্যতে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী বিশাল মহাকাশ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চীনের শিয়ানের নর্থওয়েস্টার্ন পলিটেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির মহাকাশবিজ্ঞানীদের একটি নতুন গবেষণায় এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। জুলাই মাসে ‘জর্নাল অব কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি সিসলুনার স্পেস বা পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রণক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
গবেষকদের মতে, সিসলুনার স্পেসের মহাকর্ষীয় পরিবেশ অত্যন্ত জটিল, যা মহাকাশযানের গতিপথকে পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথের তুলনায় অনেক বেশি রহস্যময় করে তোলে। এই জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে কোনো মহাকাশযান এমন সব পথে অবস্থান নিতে পারে, যা প্রতিপক্ষের জন্য শনাক্ত করা বা অনুমান করা কঠিন। প্রয়োজনে সেখান থেকে অতর্কিতে বেরিয়ে এসে পৃথিবীর কাছাকাছি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতাও তৈরি হতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং নর্থওয়েস্টার্ন পলিটেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাস্ট্রোনটিক্সের সহযোগী অধ্যাপক ডাং ঝাওহুইয়ের মতে, সরাসরি শক্তি প্রয়োগ না করেও প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা সম্ভব। তিনি জানান, প্রতিপক্ষকে ভুল পথে চালিত করা, অভিযান বিলম্বিত করতে বাধ্য করা, উৎক্ষেপণের সুযোগ নষ্ট করা কিংবা অতিরিক্ত ব্যয় করতে বাধ্য করার মতো কৌশলগুলো এই মহাকাশ যুদ্ধে বড় ভূমিকা রাখবে। সিসলুনার মহাকাশ প্রতিযোগিতায় ঝুঁকি কেবল নির্দিষ্ট কোনো কক্ষপথ বা মহাকাশযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই বিশাল অঞ্চলে প্রবেশ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার সক্ষমতাই আসল বিষয়।
গবেষণায় সিসলুনার সংঘাতকে ছয়টি ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ধাওয়া ও এড়িয়ে যাওয়া, আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা, অবরোধ ও পাল্টা-অবরোধ এবং প্রতারণা ও শনাক্তকরণের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ হিসেবে গবেষকরা বলছেন, ডিকয় বা ভুয়া মহাকাশযান, মিথ্যা গতিপথ কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হতে পারে। এতে প্রতিপক্ষ অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি খরচ করতে পারে অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কৌশলগত সুযোগ হাতছাড়া করতে পারে।
কৌশলগত সংকীর্ণ অঞ্চল বা ‘চোক পয়েন্টগুলোতে’ মহাকাশযান মোতায়েন করে প্রতিপক্ষের চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ এবং জ্বালানি-নির্ভর পথ বেছে নিতে বাধ্য করা সম্ভব। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, তাদের তৈরি মডেলের চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হতে পারে। কারণ, মহাকাশের এত বিশাল ও দুর্গম এলাকায় প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পাওয়া বা নির্ভরযোগ্যভাবে তাদের শনাক্ত করা সবসময় সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতের সিসলুনার সংঘাতে মহাকাশযানের চালচলনের পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা এবং সেই বিভ্রান্তি শনাক্ত করার সক্ষমতা সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে পৃথিবীর সংঘাত যে ভবিষ্যতে কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের আশপাশের মহাকাশেও প্রভাব ফেলবে, সেই বাস্তবতাই এই গবেষণায় ফুটে উঠেছে। তাই অসম্পূর্ণ বা বিলম্বিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চ্যালেঞ্জগুলোকেও ভবিষ্যতের গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনের শিয়ানের নর্থওয়েস্টার্ন পলিটেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির মহাকাশবিজ্ঞানীদের একটি দল এ বিষয়ে একটি বিরল গবেষণা চালিয়েছে।




















