অভ্যন্তরীণ ভোগ বা চাহিদা বাড়াতে চীনের উদ্ভাবনমুখী পদক্ষেপ - Mati News
Tuesday, October 13

অভ্যন্তরীণ ভোগ বা চাহিদা বাড়াতে চীনের উদ্ভাবনমুখী পদক্ষেপ

মাহমুদ হাশিম

হেলিকপ্টারটি যখন মাটি ছেড়ে উপরে ওঠে, তখন এর যাত্রীরা ‘জেড ড্রাগন স্নো মাউন্টেন’-এর এমন এক দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ পান, যা তাঁরা আগে কখনও কল্পনাও করেননি।

ইউনান প্রদেশের লিচিয়াং-এ অবস্থিত এই হেলিকপ্টার পরিষেবাটি শহর এবং এর আশেপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য আকাশ থেকে দেখার (ফ্লাইটসিয়িং) সুযোগ করে দেয়। এর মধ্যে ‘জেড ড্রাগন স্নো মাউন্টেন’ পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়; বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া এবং হিমবাহের মনোরম দৃশ্য এখানে দেখা যায়।

পাহাড়ের ওপর দিয়ে কম উচ্চতায় ভ্রমণের এই ব্যবস্থাটি একটি উদাহরণ যে, কীভাবে চীন তার পর্যটন খাতকে নতুন রূপ দিচ্ছে এবং ভোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

সেবা খাতের ভোগ বা ব্যবহারের ওপর চীন সত্যিকার অর্থেই গুরুত্ব দিচ্ছে। লিচিয়াংয়ের উদাহরণ চীনের সেই গুরুত্ব এবং তা বাস্তবায়ন কৌশলেরই একটি চিত্র তুলে ধরে, যা সেবা খাতে ভোগ বৃদ্ধির বিষয়ে দেশটির দৃঢ় সংকল্পকেই প্রতিফলিত করে।

পরিবারের আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে চীনের অর্থনীতি যখন উন্নয়নের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন দেশটি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে অভ্যন্তরীণ ভোগ। সরকার অভন্তরীণ ভোগের ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দিচ্ছে। জুলাই মাসে চীন ভোগের প্রসারের লক্ষ্যে বিশেষভাবে নিবেদিত তাদের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এই পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভোগ্যপণ্যের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৬০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ৮.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ভোগ্যপণ্যের মোট খুচরা বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান।

আর, চীনের অভ্যন্তরীণ ভোগ বা কেনাকাটার পরিমাণ বাড়াতে প্রযুক্তি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বেইজিংয়ের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘লংফুসি’তে দেখা যাচ্ছে কীভাবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। ৬০০ বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাসের অধিকারী এই এলাকায় একসময় শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় মন্দির-মেলা অনুষ্ঠিত হতো। আজও দর্শনার্থীরা যখন এই এলাকায় ঘোরেন, তখন তাঁরা ঐতিহ্যবাহী বেইজিং স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নীল-ধূসর ইট ও গাঢ় ধূসর রঙের টাইলস দেখতে পান, যা এর সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এলাকাটিকে এখন এমন এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে ইতিহাস ও আধুনিক প্রযুক্তির এক অপূর্ব সমন্বয় ফুটে উঠেছে।

গত জুন মাসে লংফুসিতে ‘বেইজিং ডিজিটাল ইকোনমি এক্সপেরিয়েন্স উইক’ বা ডিজিটাল অর্থনীতি বিষয়ক অভিজ্ঞতা সপ্তাহের সূচনা হয়। এই মেলায় ৪০টিরও বেশি ডিজিটাল প্রযুক্তি কোম্পানি অংশ নেয় এবং স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত খেলনা, রোবট, এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি অভিজ্ঞতা ও এআই-চালিত ই-কমার্সের মতো অত্যাধুনিক সব উদ্ভাবন প্রদর্শন করা হয়। দর্শনার্থীরা এখানে বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্য কেনাকাটার পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কেও জানার সুযোগ পান।

ঐতিহ্যের সাথে কেনাকাটার নতুন অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে লংফুসি সাংস্কৃতিক সম্পদকে অর্থনৈতিক প্রাণশক্তিতে রূপান্তর করছে এবং ভোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

অন্যদিকে চাহিদার দিক থেকে দেখলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলগুলো গ্রাহকদের ব্যবহারের ধরন ও পরিস্থিতি বুঝে বিভিন্ন পরামর্শ বা সুপারিশ প্রদানের মাধ্যমে কেনাকাটায় উৎসাহ জোগাতে পারে। গ্রাহকরা কেবল কণ্ঠস্বরের নির্দেশ দিয়েই পণ্যের অর্ডার দিতে পারেন, এআই চশমা পরে তাকিয়েই পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারেন কিংবা এআই-চালিত স্বাস্থ্যসেবা সহকারীর কাছ থেকে ফিল্টার পরিবর্তনের মতো প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা বা রিমাইন্ডার পেতে পারেন।

স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্ক ও শিশু যত্ন থেকে শুরু করে শিক্ষা, খেলাধুলা ও বিনোদন—সর্বক্ষেত্রেই চীন এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; দেশটি উৎপাদন-নির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে এখন ভোগ বা চাহিদাকেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, এবং ইতোমধ্যেই এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে।

সূত্র: সিএমজি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *