চীনা খাবার, হরেক প্রকার - Mati News
Monday, September 7

চীনা খাবার, হরেক প্রকার

আলিমুল হক, বেইজিং থেকে

চীনের রন্ধনশৈলী তথা কুজিন (Cuisine) চীনের মতই বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। বিশাল এই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস, আবহাওয়া, কৃষিজাত পণ্য, এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়েছে সেসব এলাকার রন্ধনশৈলীতে। ঐতিহ্যগতভাবে চীনে আটটি প্রধান রন্ধনধারা স্বীকৃত, যাদের একসাথে ডাকা হয় ‘পা তা ফান ছাই সি। এখানে ‘পা’ মানে ‘আট’, ‘তা’ মানে ‘বড়’, এবং ‘ছাই সি’ মানে ‘কুজিন’ বা খাবারের ধরন। আর, এই আটটি রন্ধনশৈলী বা রন্ধনপদ্ধতি হলো: শানতুং, সিছুয়ান, ক্যান্টনিজ, ফুচিয়েন, চিয়াংসু, চেচিয়াং, হুনান এবং আনহুই রন্ধনশৈলী। প্রতিটি রন্ধনশৈলীর নিজস্ব স্বাদের জগৎ, প্রস্তুতপ্রণালি, এবং খাবার পরিবেশনের রীতি রয়েছে।

চীনা খাবার

শানতুং রন্ধনশৈলীর উদ্ভব চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শানতুং প্রদেশে। এটি চীনের আটটি রন্ধনপদ্ধতির মধ্যে বলতে গেলে সবচেয়ে প্রাচীন এবং ‘উত্তর-পূর্ব চীনের রান্নার উৎস’ হিসেবে পরিচিত। শানতুং রন্ধনশৈলীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো স্যুপ ও সসের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া। এখানে পরিষ্কার ও দুধের মতো সাদা স্যুপ তৈরি করা হয়, যা অত্যন্ত সুস্বাদু। রান্নায় গরু, ভেড়া, ছাগল, ইত্যাদির মাংসের ব্যবহার এন্তার। তবে, সামুদ্রিক খাবারও এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শানতুং উপকূলবর্তী হওয়ায়, এখানে নানান ধরনের মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও ঝিনুক পাওয়া যায়। এই রন্ধনশৈলীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ভিনেগার ও লবণের ব্যবহার। তাই, খাবারের স্বাদ সাধারণত লবণাক্ত ও হালকা মসলাদার হয়ে থাকে। বিখ্যাত পদগুলোর মধ্যে আছে: ত্যচৌ তৌফু (হাতে বানানো তৌফু স্যুপ), হুয়াং মেন চি (ব্রেইজড মুরগি) ইত্যাদি। শানতুং রান্নায় সবজি কাটার কৌশলও খুব গুরুত্বপূর্ণ; কাটা হয় আকর্ষণীয় আকৃতিতে।
সিচুয়ান রন্ধনশৈলী সম্ভবত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সিচুয়ান প্রদেশের এই রন্ধনধারা, এর তীব্র মসলাদার ও ঝাল স্বাদের জন্য বিখ্যাত। সিচুয়ানের জলবায়ু আর্দ্র ও কুয়াশাচ্ছন্ন, তাই স্থানীয় মানুষ অতিরিক্ত আর্দ্রতা দূর করতে ও ক্ষুধা বাড়াতে, ঝাল ও মসলার অতিরিক্ত ব্যবহার করে থাকে। এই রন্ধনশৈলীর বিশেষত্ব হলো ‘মা লা’। এখানে ‘মা’ আসে সিচুয়ান গোলমরিচ থেকে, যা জিভে অসাড় অনুভূতি সৃষ্টি করে; আর ‘লা’ বা ‘ঝাল’ আসে বিভিন্ন ধরনের লঙ্কা বা মরিচ থেকে। সিচুয়ান রান্নায় কুড়ির অধিক মসলার সংমিশ্রণ ঘটে, ফলে এর স্বাদ হয় ঝাল ও জটিল। সিচুয়ানের রান্নায় ধনিয়া, আদা, রসুন, চিনাবাদাম, তিলের বীজ ও সিচুয়ান গোলমরিচ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বিখ্যাত সিচুয়ান পদগুলোর মধ্যে আছে: ‘কুং পাও চি তিং’ (চিনাবাদাম, চীনা পেঁয়াজ ও শুকনো লঙ্কা দিয়ে ভাজা মুরগির মাংসের টুকরো); ‘মা ফো তৌফু’ (মাংসের কিমা ও লঙ্কার সসে তৌফু); ‘সুয়ান ছাই ইয়ু’ (টক স্যুপে রান্না করা মাছ); ‘তান তান নুডলস’ (মসলাদার সস ও মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি নুডলস); এবং ‘ফু ছি ফেই ফিয়ান’ (মসলাদার তেলে ঠান্ডা গরুর মাংস)। সিচুয়ান রন্ধনশৈলী শুধু ঝালের জন্য নয়, বরং ‘সাতটি মৌলিক স্বাদের’ জন্য পরিচিত। এই সাতটি স্বাদ হচ্ছে: টক, মিষ্টি, তিতা, নোনতা, সুগন্ধি, ঝাল ও অসাড় অনুভূতি।

ক্যান্টনিজ বা কুয়াংতুং রন্ধনশৈলী চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুয়াংতুং প্রদেশ থেকে এসেছে এবং এটি পশ্চিমা বিশ্বে খুব জনপ্রিয়। ক্যান্টনিজ রান্নায় তাজা উপাদান ও হালকা স্বাদের ওপর জোর দেওয়া হয়। ভাজা, সিদ্ধ, বাষ্পে সিদ্ধ খাবার এর বৈশিষ্ট্য। ক্যান্টনিজ রান্নার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, চায়ের সাথে নাস্তা খাওয়া হয়। আর, নাস্তার মধ্যে থাকে সিয়া চিয়াও (চিংড়ির ডাম্পলিং), ফেং চাও (কালো বিন সসে ব্রেইজড মুরগির পা), ইত্যাদি। ক্যান্টনিজ রান্নায় তাজা সামুদ্রিক খাবার, শাকসবজি ও ফলমূল ব্যবহার করা হয়। হাঁস ও অন্যান্য প্রাণীর মাংসও জনপ্রিয় উপাদান। ‘শাও ইয়া’ বা হাঁসের রোস্ট ক্যান্টনিজ রান্নার বিশেষত্ব। এ ছাড়া, ‘পাই ছিয়ে চি’ (সিদ্ধ মুরগি যা আদা ও পেঁয়াজের সসে খাওয়া হয়) এবং ‘ছিং চ্যং ইয়ু’ (আদা ও সয়াসসে বাষ্পে সিদ্ধ পুরো মাছ) অত্যন্ত জনপ্রিয়। ক্যান্টনিজ রান্নায় মসলার ব্যবহার কম। এতে বরং উপাদানের প্রাকৃতিক স্বাদ ধরে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরনের সস তৈরিতেও ক্যান্টনিজ রাধুনীরা দক্ষ। ক্যান্টনিজ রন্ধনশৈলী এর সূক্ষ্মতা, বৈচিত্র্য ও স্বাস্থ্যকর দিকের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত।


ফুচিয়েন বা মিন রন্ধনশৈলীর উৎস চীনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় ফুচিয়েন প্রদেশ। এই অঞ্চল পাহাড় ও সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত, তাই এখানে সামুদ্রিক খাবার ও বনজ উপাদান এন্তার। ফুচিয়েন রান্নার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে বিভিন্ন ফারমেন্টেড সস, বিশেষ করে ‘ফিশ সস’ ব্যবহার করা হয়। এখানকার স্যুপ ও স্ট্যু জনপ্রিয়। খাবারের স্বাদ সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি মিষ্টি ও নোনতা। ফুচিয়েন রান্নায় ব্যবহৃত উপাদানের মধ্যে আছে: মাশরুম, বাঁশের কচি কান্ড, তৌফু, বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও ঝিনুক। এই রন্ধনশৈলীর বিখ্যাত পদগুলোর মধ্যে ফো থিয়াও ছিয়াং-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এটি একটি বিলাসবহুল স্ট্যু, যা হাঁস, মুরগি, শূকরের পা, ঝিনুক, হাঁসের ডিম, সাদা মাশরুম ও হাঙ্গরের পাখনা (বর্তমানে বিকল্প উপাদানও ব্যবহার করা হয়) দিয়ে দীর্ঘ সময় রান্না করা হয়। কিংবদন্তি আছে যে, এই স্ট্যুর গন্ধে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুও তার নিরামিষ ব্রত ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলেন। অন্যান্য জনপ্রিয় পদগুলোর মধ্যে আছে: ফি ফা ইয়া (হাঁসের মাংসের তরকারি); মিন নান সিয়া মিয়ান (চিংড়ির নুডলস); এবং ফু চৌ ইয়ু ওয়ান (ফিসবল বা মাছের বল)। ফুচিয়েন রান্নায় রঙের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়। এখানকার খাবারের রঙ উজ্জ্বল ও প্রাকৃতিক। মসলা কম ব্যবহার করে, বরং সসের ওপর বেশি নির্ভর করা হয়। চীনা সংস্কৃতিতে ফুচিয়েন রন্ধনশৈলীকে ‘স্বাদে মৃদু, কিন্তু সুগন্ধে তীব্র’ বলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে।
চিয়াংসু বা সু রন্ধনশৈলী চীনের পূর্বাঞ্চলের চিয়াংসু প্রদেশের ইয়াংচৌ, সুচৌ ও নানচিং শহরে উদ্ভুত। এই রন্ধনধারার সূক্ষ্মতা, মার্জিত উপস্থাপন, ও মিষ্টি স্বাদ সুপরিচিত। চিয়াংসু রান্নায় মূলত মৌসুমী উপাদান ব্যবহার করা হয়। রান্নার সময় নিখুঁতভাবে বিভিন্ন উপাদান কাটা হয়; খাবারের রঙের দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়। স্বাদ সাধারণত হালকা, সামান্য মিষ্টি ও লবণাক্ত হয়ে থাকে। এতে খুব বেশি ঝাল বা তেল ব্যবহার করা হয় না। চিয়াংসু রন্ধনশৈলীর বিখ্যাত পদগুলোর মধ্যে আছে: ইয়াং চৌ ছাও ফান (ফ্রাইড রাইস; এতে চিংড়ি, মাংস, ডিম, মটরশুঁটি ও গাজর ব্যবহার করা হয়); নেই ইয়ৌ সিয়া রেন (মাখনের সসে চিংড়ি); সি হু ছুন ছাই থাং (পশ্চিম হ্রদের ঘাসের স্যুপ); নানচিং ইয়ান শুই ইয়া (নানচিংয়ের লবণাক্ত হাঁস); ইত্যাদি। চিয়াংসু রান্নায় স্যুপও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার ‘স্যুপ ডাম্পলিং’ খুব জনপ্রিয়। এর ভিতরে গরম স্যুপ ও মাংসের পুর থাকে। চিয়াংসু রন্ধনশৈলীর একটি বিশেষ কৌশল হলো: গাঢ় সসে ধীরে ধীরে রান্না করা, যার ফলে মাংস নরম ও সুগন্ধযুক্ত হয়। এই রন্ধনধারা চীনের অভিজাত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির রান্না হিসেবে পরিচিত, কারণ এতে অতিরিক্ত সময়, ধৈর্য ও দক্ষতা প্রয়োজন।

চেচিয়াং রন্ধনশৈলীর উৎস মূলত চীনের পূর্বাঞ্চলের চেচিয়াং প্রদেশের হাংচৌ, নিংপো ও শাওশিং শহর। এই রন্ধনধারাকে ‘স্বাদে তাজা, গঠনে কোমল, গন্ধে মধুর’ বলে বর্ণনা করা হয়। চেচিয়াং প্রদেশ প্রচুর নদী, হ্রদ ও সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত, তাই এখানে মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের প্রাচুর্য রয়েছে। এ ছাড়া, বাঁশের কচি কান্ড ও চায়ের পাতাও ব্যবহৃত হয় এখানকার রান্নায়। চেচিয়াং রান্নার সবচেয়ে পরিচিত পদ হলো ‘সি হু ছু ইয়ু’ (ভিনেগারমিশ্রিত পশ্চিম হ্রদের মাছ)। নরম সাদা মাছ চিনির ভিনেগার সসে মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়। আরও কয়েকটি বিখ্যাত খাবার হচ্ছে: লুং চিং সিয়া রেন (চা পাতা দিয়ে ভাজা চিংড়ি); হুই কু থাং (ব্রেইজড মাশরুমের স্যুপ); নিং পো নিয়ান কাও (চালের পিঠা); শাও সিং জুই চি (শাও সিং ওয়াইনে রান্না করা মুরগির মাংস); ইত্যাদি। চেচিয়াং রান্নায় ফারমেন্টেশন ও ওয়াইনের ব্যবহার এন্তার। শাও সিং শহর চালের ওয়াইনের জন্য বিখ্যাত, যা রান্নায় স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়। চেচিয়াং রন্ধনশৈলী উপাদানের প্রাকৃতিক স্বাদ ধরে রাখতে বেশি তেল বা মসলা ব্যবহার করে না, বরং হালকা ও স্বাস্থ্যকর রান্নার কৌশল অনুসরণ করে।


হুনান বা সিয়াং রন্ধনশৈলী চীনের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের হুনান প্রদেশ থেকে এসেছে। সিচুয়ানের মতো হুনানের রান্নাও ঝালের জন্য বিখ্যাত, তবে এ ঝালের ধরন ভিন্ন। সিচুয়ান রান্নায় ‘মা লা’ তথা অসাড় ও ঝাল স্বাদ থাকলেও, তাজা লঙ্কার বেশি ব্যবহারের কারণে হুনানের রান্নায় ঝাল বেশি হয়। হুনানের জলবায়ু অত্যন্ত আর্দ্র, তাই স্থানীয়রা অতিরিক্ত আর্দ্রতা দূর করতে, প্রচুর লঙ্কা ও পেঁয়াজ খেয়ে থাকেন। হুনান রন্ধনশৈলীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো: স্মোকড ও ফারমেন্টেড খাবারের ব্যবহার। ‘স্মোকড তৌফু’, ফারমেন্টেড কালো বিন সস, ইত্যাদি এখানে ব্যাপক জনপ্রিয়। এই রন্ধনশৈলীর বিখ্যাত পদের মধ্যে আছে ‘মাও শি হং শাও রৌ’ (চেয়ারম্যান মাও-এর নামে নামকরণ করা একটি মসলাদার মাংসের পদ)। আরও আছে: তুং আন চি (ভিনেগার ও লঙ্কা দিয়ে রান্না করা মুরগি); লাই ইয়াং ইয়া (মসলাদার ব্রেইজড হাঁস); তুও চিয়াও ইয়ু থৌ (লঙ্কা দিয়ে বাষ্পে সিদ্ধ মাছের মাথা); ফু ফি চুয়ান (তৌফু স্কিনের রোল)। হুনান রান্নায় ‘চাও’ (ভাজা) ও ‘তুন’ (অল্প আঁচে সিদ্ধ) কৌশল বেশি ব্যবহার করা হয়। খাবারের স্বাদে তীক্ষ্ণ, টক ও নোনতার সমন্বয় ঘটে। হুনান প্রদেশ ‘চীনের লঙ্কার রাজধানী’ নামেও পরিচিত, এবং এখানকার লঙ্কা চীনের মধ্যে সবচেয়ে ঝাল বলে গণ্য। হুনান রন্ধনশৈলী প্রধানত তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কথায় বলে, হুনান খাবার খেতে বসলে পানির বোতল হাতের কাছে রাখা অত্যাবশ্যক!


আনহুই বা হুই রন্ধনশৈলী চীনের পূর্বাঞ্চলের আনহুই প্রদেশে উদ্ভুত। আনহুই প্রদেশের ভূপ্রকৃতি পাহাড়ি ও জঙ্গলাকীর্ণ, তাই এখানকার রন্ধনশৈলীতে বন্য উপাদানের ব্যবহার বেশি। হুই রান্নার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: ‘পাতা দিয়ে রান্না’ ও ‘অল্প আঁচে ধীরে ধীরে খাবার সিদ্ধ করা’। এখানে কাঠের আগুন ও মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করে, দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা হয়; ফলে খাবারের স্বাদ হয় মজাদার। আনহুই রান্নায় ব্যবহৃত উপাদানের মধ্যে আছে: বন্য মাশরুম, বাঁশের কচি কান্ড, টাটকা তৌফু, পাহাড়ি সবজি, এবং বিভিন্ন ধরনের শুকনো মাছ ও মাংস। ‘হুয়াংশান মাশরুম’ ও ‘হুইচো তৌফু’ এই রন্ধনশৈলীর বিখ্যাত উপাদান। আনহুই রন্ধনশৈলীর বিখ্যাত পদগুলোর মধ্যে আছে: লি হং চাং হুও কুও (একজন বিখ্যাত চীনা কর্মকর্তার নামে নামকরণ করা একটি স্ট্যু); ফু লি চি (ব্রেইজড কাছিম); হুই চৌ ইয়া (হুই চৌ ব্রেইজড হাঁস); সিয়াংকু সুন চিয়ান (শুকনো মাশরুম ও বাঁশের কচি কান্ডের তরকারি)। আনহুই রন্ধনশৈলীর একটি বিশেষ কৌশল হলো ‘সাও’। এ কৌশলে একাধিকবার রান্না করা ও ঠান্ডা করা হয়, যাতে মাংসের আঁশ ভেঙে যায় এবং স্বাদ গভীর হয়। আনহুই রান্নায় তেল ও সসের ব্যবহার কম, বরং উপাদানের নিজস্ব সুগন্ধের ওপর নির্ভর করা হয়। মসলাও খুব বেশি ব্যবহার করা হয় না, কারণ বন্য মাশরুম ও বাঁশের কান্ডের প্রাকৃতিক স্বাদই যথেষ্ট। হুই রন্ধনশৈলী তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত, কিন্তু এটি চীনের আটটি প্রধান কুজিনের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।


এই আটটি চীনা রন্ধনপদ্ধতি শুধু খাবার নয়, বরং চীনের দীর্ঘ ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও দর্শনের প্রতিফলন। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব স্বাদের ও রান্নার দর্শন আছে। আজ বিশ্বের প্রায় সব বড় শহরেই চীনা রেস্তোরাঁ আছে, কিন্তু সত্যিকারের চীনা রন্ধনশৈলীর স্বাদ বুঝতে হলে এই আটটি ধারার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য জানা জরুরি। চীনা রন্ধনশৈলী শুধু পেট ভরানোর মাধ্যম নয়, এটি একটি শিল্প, একটি বিজ্ঞান, এবং একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রতিটি পদ তৈরিতে রান্নার কৌশল, রঙের সমন্বয়, এমনকি পরিবেশনের পাত্র পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, চীনা রান্না খেলে শুধু খাবারের স্বাদ নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্বাদও নেওয়া হয়।
শেষ করার আগে একটি কথা। আগেই বলেছি, চীনের এই আটটি রন্ধনশৈলী সুপরিচিত; ঐতিহ্যগতভাবে স্বীকৃত। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বিশাল এই দেশটিতে ৫৬টি স্বীকৃত জাতির মানুষ নিত্যদিন যেসব রান্না করেন, তার সবগুলো এই আটটি রন্ধনধারার কোনো-না-কোনোটির আওতায় পড়বে! এমনও নয় যে, সেসব রান্না বা কুজিন চীনাদের কাছে প্রিয় নয়। আমি এই আট ধরনের রান্নার বলতে গেলে সবকটির সাথেই কমবেশি পরিচিত, স্বাদ গ্রহণের দিক দিয়ে। আবার, সিনচিয়াং ও নিংসিয়া ভ্রমণকালে সেখানকার বিশেষ রন্ধনশৈলীর সাথেও আমার পরিচয় ঘটেছে। বিশেষ করে সিনচিয়াং কুজিনের স্বাদ অতুলনীয় মনে হয়েছে আমার কাছে। বলতে চাচ্ছি, বিশাল চীনের রন্ধনশৈলীর সংখ্যা অনায়াসে ৮ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা সম্ভব!

লেখক: সম্পাদক, বাংলা বিভাগ, চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *