চীনের এই দামি আখরোট খাওয়ার জন্য নয়! - Mati News
Tuesday, November 3

চীনের এই দামি আখরোট খাওয়ার জন্য নয়!

 

সাকিব সিকান্দার

আট বছর আগে মিলানে ইতালির কনটেন্ট ক্রিয়েটর ক্যারোলিনা ডি কন্ডিও প্রথমবারের মতো তার হবু স্বামীর সঙ্গে পরিচিত হন। তার স্বামী একজন চীনা। তখন তিনি একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন। তার স্বামী সবসময় হাতের তালুতে দুটি আখরোট ঘোরাতেন।

 

 

আখরোট ঘোরানোর এই কৌশল ও টুকটুক শব্দে মুগ্ধ হয়ে ডি কন্ডিও নিজেও চেষ্টা করেন। তবে দেখতে যতটা সহজ মনে হয়েছিল, বাস্তবে তা ততটা সহজ ছিল না।

কিন্তু একটি প্রশ্ন তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি জানতে চান, ‘আমি কি এগুলো ভেঙে খেতে পারি?’

এ কথা শুনে তার স্বামীর মুখের অভিব্যক্তি ছিল মনে রাখার মতো। সেখানে একইসঙ্গে বিস্ময় ও আতঙ্কের ছাপ ছিল।

এভাবেই ডি কন্ডিওর পরিচয় ঘটে চীনের ঐতিহ্যবাহী ওয়েনওয়ান আখরোটের সঙ্গে। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘খেলনা আখরোট’। এগুলো খাওয়ার জন্য নয়। বরং শতাব্দী প্রাচীন একটি চীনা শখের অংশ হিসেবে বিশেষভাবে চাষ ও বাছাই করা হয়। এ শখে মানুষ হাতের তালুতে আখরোট ঘোরান। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ঘোরানোর ফলে আখরোটের খোসা ধীরে ধীরে মসৃণ ও চকচকে হয়ে ওঠে। একসময় এগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহের মূল্যবান সামগ্রীতে পরিণত হয়।

কয়েক বছর পর ফ্যাশন ব্র্যান্ড ডিওরের একটি আমন্ত্রণপত্রে একজোড়া ওয়েনওয়ান আখরোটের ছবি দেখে বিষয়টি আবারও তার নজরে আসে। ফ্যাশন জগতে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ডি কন্ডিও চীনের এই ঐতিহ্যের সঙ্গে বিলাসবহুল পণ্য তৈরির কারুশিল্পের মিল খুঁজে পান।

ডি কন্ডিও বলেন, ‘দীর্ঘদিন যত্ন নেওয়া ও ঘোরানোর ফলে আখরোটের গায়ে যেমন ধীরে ধীরে নিজস্ব ঔজ্জ্বল্য তৈরি হয়, তেমনি আমার বিশ্বাস। সুন্দর জিনিসের মূল্য অনেক সময় এর পেছনে দেওয়া সময়, কারুশিল্প ও যত্নের মধ্যেই নিহিত থাকে।‘

চীনের কিছু সংগ্রাহকের ক্ষেত্রে এই আখরোট কেনার আগেই এই বিনিয়োগ শুরু হয়।

হ্যপেই প্রদেশের লাইশুই কাউন্টির ৩৬ বছর বয়সী আখরোট ব্যবসায়ী ওয়াং হোংতুও বিষয়টি ভালোভাবেই জানেন।

প্রায় পাঁচ বছর আগে বিরল প্রজাতির ওয়েনওয়ান আখরোট নিয়ে কাজ করা ওয়াং ৯টি স্বতন্ত্র খাঁজযুক্ত একটি ব্যতিক্রমী আখরোট সংগ্রহ করেন।

তিনি বলেন, ‘একটি ভালো আখরোটের আকৃতি ভারসাম্যপূর্ণ এবং খাঁজগুলো সমানভাবে সাজানো থাকা উচিত। জোড়া তৈরি করতে হলে দুটি আখরোটের মধ্যেও ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য থাকতে হবে।‘

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্য এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে একই বৈশিষ্ট্যের আরেকটি আখরোটের সন্ধান পান ওয়াং। এর ফলে অবশেষে তিনি আখরোট দুটির জোড়া সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হন।

তার দীর্ঘ অপেক্ষার ফল মেলে চলতি বছরের ১৬ অক্টোবর স্থানীয় একটি প্রতিযোগিতায়। সেখানে ব্যতিক্রমী আকৃতি বিভাগে জোড়াটি প্রথম পুরস্কার অর্জন করে। পরে অনন্য এই জোড়াটির জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার ইউয়ানের (৬৭ হাজার ৬৭০ ডলার) প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন ওয়াং। দামটি ছিল ব্যতিক্রমী। তবে যারা এই শখ শুরু করতে চান, তাদের জন্য একজোড়া আখরোট কিনতে কয়েক দশক থেকে কয়েকশ ইউয়ানই যথেষ্ট।

সংগ্রহযোগ্য সামগ্রী হিসেবে ওয়েনওয়ান আখরোটের জনপ্রিয়তা নতুন নয়। মিং (১৩৬৮-১৬৪৪) ও ছিং (১৬৪৪-১৯১১) রাজবংশের আমলে এ ঐতিহ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। তখন পণ্ডিত ও ধনী সংগ্রাহকেরা আখরোটের স্বতন্ত্র আকৃতি, সূক্ষ্ম নকশা এবং সময়ের সঙ্গে তৈরি হওয়া চকচকে আবরণের জন্য এগুলোকে মূল্য দিতেন।

চীনের বাইরেও এই আগ্রহ ছড়িয়ে পড়েছে। চীনা আখরোট নিয়ে মানুষের খেলার ভিডিও টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শকের কাছে এই অপরিচিত ঐতিহ্য পরিচিতি পাচ্ছে।

ইতালির কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডি কন্ডিও মাঝেমধ্যে তার স্বামীর কাছ থেকে নিয়ে ওয়েনওয়ান আখরোট ঘোরান। তবে মজা করে বলেন, তার হাত ছোট হওয়ায় নিজের জন্য একজোড়া হ্যাজেলনাট প্রয়োজন।

এই ঐতিহ্যের মধ্যে তিনি ইতালির ‘লা ডলসে ভিটা’ ধারণার সঙ্গে মিল খুঁজে পান। এই ধারণায় জীবনের সাধারণ আনন্দ উপভোগ করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

তার মতে, সারাক্ষণ ফোনের নোটিফিকেশন ও কাজের অন্তহীন তালিকার এই যুগে এ শখ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসার একটি বিকল্প হতে পারে।

সূত্র: সিএমজি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *