শরীর ও প্রেমের ভাষা: শৈশবের নীরবতা ভেঙে আত্মোপলব্ধির পথে - Mati News
Tuesday, August 25

শরীর ও প্রেমের ভাষা: শৈশবের নীরবতা ভেঙে আত্মোপলব্ধির পথে

নিজের জীবনের কিছু সত্য প্রকাশ করা সবসময়ই কঠিন। শৈশবের সেই ছোট্ট সংস্করণের মুখোমুখি হওয়া এক আবেগঘন অভিজ্ঞতার নাম। অনেক বছর আগে জাপানে থাকাকালীন ছয় কি সাত বছর বয়সে এক বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন আনুশেহ আনাদিল। সেই ঘটনার স্মৃতি আজও তাকে তাড়িত করে। সালফারের মতো তীব্র গন্ধ, শারীরিক যন্ত্রণা এবং বমি হওয়ার মতো অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো আজও তার মনে গেঁথে আছে। সেই সময় শিশুমন ঘটনার অর্থ না বুঝলেও শরীর সেই ভয়ের ভাষা ঠিকই শিখে নিয়েছিল।

শৈশবের সেই অসহায় মুহূর্তে বড়দের কাছে সাহায্য চাওয়ার বদলে উল্টো নিজেকে এবং বাবা-মাকে রক্ষা করার এক অদ্ভুত তাড়না কাজ করেছিল। শিশুর ভয় যুক্তির ধার ধারে না, তাই সেই নীরবতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। তবে এই অভিজ্ঞতা তাকে ভেঙে ফেলার বদলে এক ধরনের প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল। কৈশোরে একা চলার পথে যখনই যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন, তখনই সেই ভীত শিশুটি এক বুনো কিশোরীতে পরিণত হয়েছে। চিৎকার করা, লড়ে যাওয়া এবং নিজের সীমানা রক্ষা করা—এভাবেই তিনি নিজেকে বাঁচতে শিখিয়েছেন।

তবে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের পথটি সহজ ছিল না। সাহায্য চাইতে গিয়ে অনেক সময় উল্টো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। কেন একা ছিলেন বা কী পোশাক পরেছিলেন—এমন সব প্রশ্ন অপরাধীর দায়ভারকে আড়াল করে ভুক্তভোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে থাকা অন্ধকারকেও তিনি গভীরভাবে দেখেছেন। পথশিশু মুনিরের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, ধর্মীয় শিক্ষকের কাছেও শিশুরা নিরাপদ নয়। মাদ্রাসা, গির্জা, আশ্রম কিংবা স্কুল—সবখানেই এই অন্ধকার বিদ্যমান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিয়ে বা কোনো সম্পর্কই অন্য কারো শরীরের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে না। বয়স, সম্পর্ক বা ভালোবাসা—কোনো কিছুই শরীরের মর্যাদা কেড়ে নিতে পারে না।

নিজের সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাষা বেছে নিয়েছেন। তার ছেলের ক্ষেত্রে যেমন শরীরের প্রতি দায়িত্ব ও সম্মতির শিক্ষা দিয়েছেন, মেয়ের ক্ষেত্রেও ঋতুস্রাবকে ভয়ের বদলে উদযাপনের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাবের দিনটি ছিল পূর্ণিমা। সেই আনন্দকে তিনি মা ও বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন, যাতে মেয়েটি নিষেধের তালিকার বদলে সাহস ও মমতা পায়।

তিনি মনে করেন, শরীর নোংরা নয়, রক্ত নোংরা নয়, আকাঙ্ক্ষাও নোংরা নয়। নোংরা হলো ক্ষমতার জোরে অন্যের শরীর দখল করা এবং শিশুকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা। সমাজ এতদিন শরীরকে লজ্জা দিয়ে সহিংসতাকে আড়াল করেছে। এখন সময় এসেছে সেই নীরবতা ভাঙার।

আনুশেহ আনাদিলের মতে, সহিংসতা শরীরের দরজা ভেঙে ঢোকে, আর প্রেম বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। সহিংসতা কেড়ে নেয়, কিন্তু প্রেম জানতে চায়। তাই শরীর ও প্রেম নিয়ে আরও খোলামেলা ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা প্রয়োজন। যাতে কোনো শিশুই নিজের শরীরকে ভয়ের চোখে না দেখে, আর কোনো কিশোর নিজের আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষমতার অস্ত্র হিসেবে ভুল না করে।

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান কোনো করুণা পাওয়ার জন্য নয়, বরং পৃথিবীর অসংখ্য নারী ও পুরুষের শরীরের ভেতর জমে থাকা না-বলা ইতিহাসকে সামনে আনার একটি প্রচেষ্টা। ক্ষত শুধু মানুষকে ভাঙে না, বরং তার ভেতর দিয়েই নিজের শক্তিকে চিনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। স্বাধীন হতে শেখা এবং নিজের শরীর ও বিশ্বাসের ওপর অন্যের মালিকানা অস্বীকার করাই এখন তার জীবনের মূল দর্শন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই লেখাটি লিখতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শরীর, রক্ত, আকাঙ্ক্ষা, যৌনতা, নির্যাতন—সবকিছুর চারপাশে আমরা এত ‘চুপ’ বসিয়ে দিয়েছি যে যার সঙ্গে অন্যায়টি ঘটে, অনেক সময় সে-ই জানে না তার অভিজ্ঞতার ভাষা কী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই ব্যথার কথা আমি বাইরে থেকে শুনিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শুধু জানি, এতটাই ছোট ছিলাম যে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, সম্মতি—এসব শব্দ তখনও আমার পৃথিবীতে জন্মায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একজন বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ মানুষ, যাঁকে কোনো কারণে আমার পরিবার বিশ্বাস করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কীভাবে তাঁর সঙ্গে একা হয়েছিলাম, তাও মনে নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কখনো মনে হয়, হয়তো কোনো চলন্ত বাসে ছিলাম; স্মৃতির ভেতর আজও চারপাশ দ্রুত ছুটে যাওয়ার একটি অনুভূতি আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সত্যিই কি কিছু চলছিল, নাকি আতঙ্কে আমার ছোট্ট পৃথিবীটাই দুলছিল—জানি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *