বিশ্ব নগর দিবস: চীনের টেকসই নগর উন্নয়ন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা - Mati News
Thursday, October 29

বিশ্ব নগর দিবস: চীনের টেকসই নগর উন্নয়ন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা

ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা
ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা

 

প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব নগর দিবস। এ বছর মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে চীনের ফুচৌ শহরে, যার প্রতিপাদ্য—‘নবায়ণের ক্ষমতায়ণে, বাসযোগ্য স্বপ্ন নির্মাণ’।

ঢাকার সকাল-সন্ধ্যার যানজটে যদি আপনি কখনও আটকে থাকেন, তাহলে এই প্রতিপাদ্য আপনার কাছে দূরের বিষয় নয়। এটি আপনার প্রতিদিন নষ্ট হওয়া শত শত মিনিট, উড়ালসড়ক থেকে শুরু করে পয়ঃনিষ্কাশন এবং একটি উচ্চ ঘনত্বের শহর কীভাবে আরও বাসযোগ্য ও টেকসই করা যায় এসবেরই বিষয়।

চীনের টেকসই নগর উন্নয়নের মূল কথা কিন্তু ‘কত নতুন শহর তৈরি হলো, কত উঁচু ভবন উঠলো’ তা নয়। নগর উন্নয়ন হলো মানুষকে নগর কাজের কেন্দ্রে রাখা, নগর নবায়ন, গণপরিবহন অগ্রাধিকার, সবুজ-নিম্ন কার্বন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানুষের আবাসকে আরও নিরাপদ, সুবিধাজনক ও টেকসই করা।

চীনের নগর উন্নয়ন এখন যে স্লোগান মেনে চলে তা হলো ‘রাখা-পরিবর্তন-ভাঙা’। একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে এখানে, ব্যাপক ভাঙা-গড়ার ওপর নয়।

শাংহাইয়ের ফেংই আবাসিক এলাকার বাসিন্দা চৌ হুংশুন নতুন বাসস্থানের চাবি হাতে পেয়ে বলেছিলেন, সংস্কার প্রকল্পই তার পুরনো বাড়িকে নতুন জীবন দিয়েছে। ছোংছিংয়ের মিনচু গ্রামের পুরনো বাসিন্দারা দেখেছেন, এলাকায় নতুন পাথর বসেছে, রেলিং লাগানো হয়েছে, রাতে বাতি জ্বলছে। জীবন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে তাদের।

এই আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয়—নগর নবায়নে প্রথমে নিরাপত্তা, সুবিধা ও মর্যাদার ঘাটতি পূরণ করতে হবে, তারপর ভাবতে হবে ‘চেহারা’ উন্নয়নের কথা।

ঢাকার বাসিন্দা পারভীনের অনুভূতি খুব স্পষ্ট। ঢাকা বিমানবন্দর উড়ালসড়কের প্রথম পর্যায় চালু হওয়ার পর তার অফিসে যাওয়ার সময় ৪০ মিনিট থেকে কমে ৫ মিনিটে নেমে আসে। চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে নির্মিত এই উড়ালসড়ক বাংলাদেশের প্রথম উড়ালসড়ক, যার মূল লাইন প্রায় ২০ কিলোমিটার। এটির নির্মাণকালে স্থানীয়ভাবে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। যন্ত্রপাতি-সামগ্রী ও জনবলের ৮০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশ থেকেই নেওয়া হয়।

নানচিং এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া রাকিবুল হাসান ২০২০ সালে প্রকল্প শুরুর সময়ই ঢাকায় ফিরে যান। এরপর প্রায় তিন বছর প্রায় প্রতিদিন নির্মাণস্থলে কাটিয়েছেন, নিরাপত্তা ও অনুবাদকের কাজ করেছে। নিজের চোখে দেখেছেন উড়ালসড়কটিকে উঠে দাঁড়াতে। এর মাঝে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়েছে তার নগর বিষয়ক অভিজ্ঞতাও।

চীনে পরিবহন ব্যবস্থাকে অনেক সময় বড় শহরের মেরুদণ্ড হিসেবে দেখা হয়, যা দিয়ে শহরের ক্ষত ‘সেলাই’ করা সম্ভব। আর এই সেলাইতেই যাতায়াতের সময়, কর্মসংস্থানের পরিধি এবং গণসেবার আওতা ‘সুস্থ’ হয় একযোগে।

প্রকল্প শেষে শুধু গাড়ির দ্রুত চালাচল ঘটে, তা নয়; স্থানীয় কর্মী, সাব-কনস্ট্রাক্টর এবং স্থানীয় পরিচালকদের সক্ষমতারও উন্নতি ঘটে।

চীনের টেকসই নগর উন্নয়নে স্পঞ্জ শহর, স্থিতিস্থাপক শহর, গণপরিবহন অগ্রাধিকার, হাঁটাচলা-বান্ধব, সবুজ পরিসর, ভবন শক্তি সাশ্রয় এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রতিটি রাস্তা, পাইপলাইন, প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দক্ষতা বাড়ানোই এখানে মূল বিষয়।

বাংলাদেশ চীন গবেষণা কেন্দ্রের বাংলাদেশ পক্ষের পরিচালক শামসাদ মুরতুজা এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, যানজট, বায়ুদূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চীনের নগরায়ণ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, চীনের শহরগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগানোর মতো ঢাকা নিজের বিস্তৃত নদী নেটওয়ার্ক গণপরিবহনে ব্যবহার করতে পারে। শহরের আলো সাশ্রয়, ভবন শক্তি দক্ষতা ও উপকণ্ঠ নবায়নেরও সুযোগ আছে।

নগর উন্নয়নে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা এখন উড়ালসড়কে সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকা বিমানবন্দর উড়ালসড়কের প্রথম পর্যায় যাতায়াতের সময় কমিয়েছে। ঢাকা পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক ডাব্লিউডি২ চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রথম মাইক্রো-টানেল বোরিং প্রযুক্তি চালু হচ্ছে, শহরের কেন্দ্রে মাটির নিচে ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার পয়ঃনিষ্কাশন প্রধান পাইপ বসানো হচ্ছে, যাতে যানজট ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব যথাসম্ভব কমানো যায়।

অপরদিকে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ‘স্মার্ট বন্দর, আদর্শ বন্দর’-এর মডেল নির্ধারণ করা হয়েছে। চীনা প্রতিনিধিদল বগুড়া শহরের সঙ্গে সৌর স্ট্রিটলাইট, আধুনিক নিষ্কাশন, এআই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জিআইএস সমন্বিত ম্যাপিং নিয়ে আলোচনা করেছে।

এগুলো একযোগে দেখলে, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে ‘অবকাঠামো + নগর ব্যবস্থাপনা + সবুজ প্রযুক্তি + স্থানীয় জনবল উন্নয়ন’-এর সমন্বয়ে, একক কোনো প্রকল্পে নয়।

বাংলাদেশের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহাবুল হক মনে করেন, চীনা ধারার আধুনিকায়ন গ্লোবাল সাউথের জন্য আরও ন্যায্য, আরও টেকসই ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পথের বিকল্প তৈরি করেছে।

সত্যিকারের মূল্যবান সহযোগিতা মানে একটি শহরের জন্য একটি প্রকল্প নির্মাণ নয়, বরং তাকে স্ব-নবায়ন, স্ব-পরিচালনা ও স্ব-উন্নতির ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করা। নবায়ন মানে একটি শহরকে অন্য একটি শহরে পরিণত করা নয়, বরং শহরের মানুষের জীবনযাত্রা চালিয়ে যাওয়া ও একটু ভালো হওয়াটা নিশ্চিত করা।

আর তাই, পারভীনের বেঁচে যাওয়া যাতায়াতের সময়, চৌ হুংশুনের হাতে নতুন বাড়ির চাবি, রাকিবুল হাসানের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা—এসবই টেকসই নগর উন্নয়নের অর্থ আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

চীন ও বাংলাদেশের জন্য সহযোগিতার সম্ভাবনা হলো—চীনের নগর নবায়ন ও সবুজ ব্যবস্থাপনার ধারণাকে ঢাকা ও অন্যান্য বাংলাদেশি শহরের জন্য বহনযোগ্য, পুনরাবৃত্তিযোগ্য ও রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তর করা।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *