ফয়সল আবদুল্লাহ, বেইজিং থেকে
পর্যটন বলতে আমরা সচরাচর বুঝি, সবাই যা দেখে সেটাই দেখতে যাওয়া। নতুন দিনের বিশ্বে এই সংজ্ঞাই শেষ কথা নয়। পর্যটন মানে এখন আর শুধু ছুটির দিনে নামকরা কিছু জায়গায় লাইন ধরে টিকিট কেটে ঘুরতে যাওয়া নয়। ছুটির সময়ে যে স্থান বা ঐতিহ্য আমাদের আবেগ ও অনুভূতিকে সত্যিকার অর্থে নাড়া দিতে পারে সেটাও হয়ে যেতে পারে পর্যটনের হটস্পট। পর্যটন হতে পারে এমন কিছু ঘটনার অভিজ্ঞতা ঝুলিতে ভরে নেওয়া, যা মনে থাকবে আজীবন। আর এমনটাই করে দেখিয়েছে চীন। দেশটিতে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে নতুন ধাঁচের ‘স্রোতের বিপরীতে পর্যটন’। ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে ‘রিভার্স ট্যুরিজম’। চীনের দেখাদেখি পর্যটনের এই নতুন হাওয়া যদি বাংলাদেশেও লাগে, তবে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি উপকৃত হবে, তেমনি খুলে যেতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আসার পথ।
পর্যটনে রয়েছে নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ। সেই আবিষ্কারের দায়িত্ব কিন্তু বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারি দপ্তরের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে নেই চীনের মানুষরা। তারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে বের করে নিচ্ছে নতুন স্থান ও নতুন গল্প তৈরির রাস্তা। তাদের কাছে পর্যটন এখন স্রেফ দেখার জায়গা নয়, অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের বিষয়।
আর এ কারণেই এখন গ্রেট ওয়াল, টেরাকোটা সেনাবহর, কিংবা চাংচিয়াচিয়ের খাড়া পাহাড়ের ভিড় এড়িয়ে অনেকেই ছুটে যাচ্ছেন পুরনো ছোট শহর, কাউন্টি, পাহাড়ি জনপদ, নদীর পাড় কিংবা এমন কোনো গ্রামে, যার নাম হয়তো ডিজিটাল মানচিত্রেও খুঁজে পেতে সময় লাগে।
‘রিভার্স ট্যুরিজম’ বা প্রচলিত পর্যটনস্রোতের বিপরীতে এই ভ্রমণের প্রতি ঝোঁক বেড়েছে মূলত চীনের তরুণ প্রজন্মের মাঝে। তবে এই রিভার্স ট্যুরিজম শুধু ভিড় এড়ানোর গল্প নয়; এর ভেতরে আছে পর্যটনের নতুন এক দর্শন।
চীনের তরুণ পর্যটকরা এখন স্থানীয় বাজারে হাঁটতে চান, গ্রামের খাবার খেতে চান, কোনো পুরনো কারুশিল্প নিজের হাতে বানিয়ে দেখতে চান, নদীর ওপর নৌকায় বসে গল্প শুনতে চান, কিংবা সন্ধ্যার পর কোনো ছোট শহরের আলো-আঁধারি রাস্তায় ধীরে ধীরে হাঁটতে চান। অর্থাৎ পর্যটকের চোখ এখন শুধু ‘দেখতে’ চায় না; সে ‘অনুভব’ করতে চায়।
চীনের এই পরিবর্তনের পেছনে আছে কিছু বাস্তব কারণ। ছোট শহর ও কাউন্টিগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক উন্নত। গাড়ি ভাড়া, পথনির্দেশনা, হোমস্টে বা অপ্রচলিত আবাসন—সবই সহজলভ্য হয়েছে। ফলে পর্যটকরা এখন একটি বিখ্যাত শহরকে কেন্দ্র করে আটকে না থেকে পাশের দুই-তিনটি কাউন্টি, পাহাড়, নদী, পুরনো জনপদ ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাকে মিলিয়ে নিজের মতো করে ভ্রমণপথ তৈরি করতে পারছেন।
চীনা পর্যটকরাও আগের তুলনায় অনেক হিসাবিও বটে। তবে এই হিসাব খরচের ক্ষেত্রে নয়। তারা চান কম ভিড়, স্বস্তিদায়ক জায়গা, স্থানীয় খাবার, পরিচিতির বাইরে নতুন অভিজ্ঞতা এবং এমন একটি ভ্রমণ, যা পরে জমিয়ে তুলতে পারবে একটি গল্পের আসর।
চীনের ভ্রমণ বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘মাফেংও’-এর তথ্য বলছে, বিকল্প পর্যটন সংক্রান্ত অনুসন্ধান ও তা দেখার হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবণতার ৬০ শতাংশের মূলে রয়েছে ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা।
ফুচিয়ানের ফুচৌ শহরের কথা ধরা যাক। শহরের নদীগুলো একসময় ছিল অবহেলিত। দ্রুত নগরায়ণের চাপে কোথাও পানি দূষিত হয়েছে, কোথাও নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কই যেন হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শহর কর্তৃপক্ষ প্রথমে নদীকে পর্যটনের পণ্য বানানোর কথা ভাবেনি; তারা আগে নদী বাঁচানোর কাজ করেছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদী পরিষ্কার, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং নদীর দুই তীরে সবুজ পথ তৈরির মাধ্যমে ধীরে ধীরে বদলে দেওয়া হয়েছে জলপথের চেহারা। ১২১টি জলপথের সংস্কার এবং প্রায় ৬৮০ কিলোমিটার নদীতীরবর্তী সবুজ পথ তৈরির পর যখন নদী আবার শহরের প্রাণের অংশ হয়ে উঠল, তখন শুরু হলো দ্বিতীয় অধ্যায়—পর্যটন।
ফুচৌয়ের পানি, ফুচৌয়ের নৌকা নামে চালু হওয়া একটি উদ্যোগে এখন ফুচৌয়ের নদীপথে নৌভ্রমণের একাধিক ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। প্রায় ৭৫ কিলোমিটারের ২৯টি দর্শনীয় নৌপথ তৈরি হয়েছে এ প্রকল্পে। এর মধ্যে ১০টি নিয়মিত চালু থাকে। চিনআন নদীর প্রায় ৭ কিলোমিটারের একটি পথে নৌকায় চড়ে পর্যটক দেখতে পারেন উষ্ণ প্রস্রবণ, জলপথ-সংক্রান্ত প্রদর্শনীকেন্দ্র, পুরনো সেতু এবং সেতুর গায়ে আঁকা মিন রাজ্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের চিত্র। অর্থাৎ এখানে নৌকাটি শুধু বাহন নয়—নৌকাটিই হয়ে উঠেছে চলমান গল্পের মঞ্চ।
এখানে কিন্তু পর্যটনকে সামনে রেখে নদীর উন্নয়ন ঘটায়নি ফুচৌ কর্তৃপক্ষ, নদীকে মানুষের জন্য ফিরিয়ে দেওয়ার পর পর্যটন সেখানে স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নিয়েছে।
এর ফলও এসেছে। প্রকল্পটি চালুর পর থেকে ৯ লাখের বেশি মানুষ এসব জলপথে ভ্রমণ করেছেন এবং এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে ৮ কোটি ইউয়ানের বেশি।
একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে চীনের গ্রাম ও ছোট শহরেও। সি’আনে টেরাকোটা যোদ্ধাদের দেখতে যাওয়া পর্যটকের কাছে এখন শুধু জাদুঘর ঘুরে আসাই যথেষ্ট নয়। কোনো কোনো পর্যটক কাছের কারুশিল্পকেন্দ্রে গিয়ে নিজের হাতে ছোট টেরাকোটা যোদ্ধার মূর্তি তৈরি করছেন।
চীনে এই প্রবণতার আরেকটি বড় দিক হলো—পুরনো জায়গাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। ফুচৌয়ের কুলিয়াং এলাকার চুকাংতিং একসময় ছিল অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পর সেখানে তৈরি হয়েছে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জায়গা, রাতের সাংস্কৃতিক আয়োজন, ফল তোলার ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক বাজার এবং তারাভরা আকাশ দেখার ব্যবস্থা।
চীনের পর্যটনের এই নতুন দর্পণে তাকালে বাংলাদেশের জন্য উঁকি দেয় হাজারো সম্ভাবনা। যেমন, সিলেটের চা-বাগান তো অনেক দেখা হলো, থাকা হলো নামিদামি রিসোর্টেও। এবার কণকণে এক শীতের রাতে স্থানীয় কোনো চা-শ্রমিক পল্লীতে মিটমিটে আলোয় গা ছমছমে পরিবেশে একটি রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা পেলে কেমন হয়? আবার ধরুন কোনো এক পল্লীগ্রামে জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরা কিংবা ধরুন মনিপুরি পাড়ায় গিয়ে তাঁতিদের সঙ্গে নিজের হাতে নিজের জন্য একটা কাপড় বুনে নেওয়া। আবার রাতের বেলায় হাওরের পানিতে ছই নৌকায় ভেসে ভেসে পিকনিক করলেও তো মন্দ না।
অর্থাৎ বাংলাদেশের পর্যটনকে যদি শুধু কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেট কিংবা বান্দরবানের কয়েকটি গন্তব্যে আটকে রাখা হয়, তা হলে পর্যটনের সুফলও সীমিত কয়েকটি এলাকায় ঘুরপাক খাবে।
অথচ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেরই নিজস্ব কোনো না কোনো গল্প আছে—কোথাও নদী, কোথাও হাওর, কোথাও পুরনো জমিদারবাড়ি, কোথাও মৃৎশিল্প, কোথাও তাঁত। এখানে পর্যটকদের শুধু এগুলো দেখালেই চলবে না, তাকে বলতে হবে—আসুন, আপনি নিজেই একটি নকশিকাঁথা তৈরি করুন। নিজের হাতে মাটির পুতুল বানান। আর না হয় শীতের রাতে অজপাড়াগাঁয়ের উঠোনে বসে ঝটপট বানিয়ে ফেলুন ভাপা পিঠা। তখন সেই পর্যটক শুধু তার ফোনে কিছু ছবি নিয়ে ফিরবেন না। ফিরবেন চিরস্থায়ী কিছু স্মৃতি নিয়ে।
চীনে যেমন গ্রাম বা দুর্গম অঞ্চলে আছে নিরাপত্তা বলয়ে হোমস্টের ব্যবস্থা, তেমনি বাংলাদেশেও প্রত্যন্ত গ্রামে পর্যটকদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করা যায়। নতুন করে অবকাঠামোয় বিনিয়োগ না করে এখানে মূলত খুঁজে বের করতে হবে নতুন কী অভিজ্ঞতা দেওয়া যায়।
চীনের ‘রিভার্স ট্যুরিজম’ তাই শুধু পর্যটকদের বিপরীত দিকে হাঁটার গল্প নয়। এটি আসলে পর্যটনের অর্থনীতিকে ছড়িয়ে দেওয়ার গল্প।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা















