পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকস ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান - Mati News
Saturday, October 3

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকস ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার মানচিত্র কখনোই স্থির থাকে না। অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে যে রাষ্ট্রগুলো একসময় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রান্তে ছিল, তারাই ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে। ব্রিকসের উত্থানকে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের একটি অংশ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। এটি কেবল উদীয়মান অর্থনীতির একটি জোট নয়, বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা, অর্থ ও প্রতিনিধিত্বের অসম বণ্টনের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত ব্রিকস এখন অনেক বিস্তৃত। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া—এই ১১টি দেশ এর সদস্য। এছাড়া বেশ কিছু রাষ্ট্রকে অংশীদার দেশের মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি এখন বৃহত্তর দক্ষিণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছিল, যখন বর্তমানের অনেক উদীয়মান শক্তির সক্ষমতা ছিল সীমিত। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র এখন পরিবর্তিত। চীন ও ভারত বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে; ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্রিকসের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অধিকতর বহুকেন্দ্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলা।

ব্রিকসের একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হলো নতুন উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি)। এই ব্যাংক অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি, নগরায়ণ ও টেকসই উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকে এই ব্যাংকের সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জন্য এই ব্যাংক থেকে অনুমোদিত অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, এর একটি কার্যকর আর্থিক ভিত্তিও রয়েছে।

অনেকে ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট মনে করলেও এটি অতিসরলীকরণ। ভারত যেমন ব্রিকসের সদস্য, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গেও তাদের গভীর কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখে। তাই ব্রিকসের তাৎপর্য পশ্চিমকে প্রতিস্থাপনে নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিকল্প দর-কষাকষির ক্ষেত্র তৈরির মধ্যে নিহিত।

বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বৈদেশিক অর্থায়ন ও বাজার সুবিধার জন্য নতুন উৎস খুঁজতে হবে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনপর্বে একটি বড় অবলম্বন হতে পারে। এছাড়া এটি বাংলাদেশের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কার্যকর ও বহুমুখী করার সুযোগ দেয়। একটি মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রের কৌশলগত সাফল্য কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে বরং একাধিক কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যেই নিহিত।

তবে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। দেশটির রপ্তানি ও উন্নয়ন সহযোগিতায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্রিকসে যোগদানকে যদি কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখা হয়, তবে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

ব্রিকসের ভেতরেও কিছু জটিলতা রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধ বিদ্যমান। এত বৈচিত্র্যের মধ্যে ব্রিকস কতটা সুসংহত রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে, তা এখনো অনিশ্চিত। এছাড়া সদস্যপদ মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ বা বাণিজ্য বৃদ্ধি নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল ও দক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতি।

পররাষ্ট্রনীতিতে সদস্যপদ কোনো অলংকার নয়, বরং একটি উপকরণ। ব্রিকসে প্রবেশের লক্ষ্য যদি কেবল নতুন পরিচয় অর্জন হয়, তবে তার মূল্য সীমিত। কিন্তু যদি এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অবকাঠামো অর্থায়ন, নতুন বাজার, জ্বালানিনিরাপত্তা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এর কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি।

আজকের বিশ্বে ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে এবং নতুন মেরু তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো একটি শিবির নির্বাচন করা নয়, বরং নিজের অবস্থানের মূল্য বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য তখনই আসবে, যখন ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেও ওয়াশিংটনকে হারাবে না, দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা রেখেও নিজস্ব কৌশলগত স্বাতর্থ্য বজায় রাখবে এবং মস্কোর সঙ্গে কাজ করেও ব্রাসেলসের বাজারকে বিপন্ন করবে না।

ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কারও অনুগ্রহনির্ভর না হয়ে সবার কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার সক্ষমতা। ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য সেই সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পথ হতে পারে, যদি সদস্যপদকে গন্তব্য নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরবর্তী সময়ে এর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারতে ব্রিকস সম্মেলন: বিশ্বনেতাদের মধ্যে কেন চাপা দুশ্চিন্তা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিকস মূলত এই অসামঞ্জস্যের জায়গাটিতেই প্রবেশ করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিকস কি অন্য আঞ্চলিক সংস্থার জন্য হুমকি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, ব্রিকস প্রকৃত অর্থে কোনো আঞ্চলিক সংস্থা নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ, এর সদস্যরা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্র এতে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *