বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীনের তৈরি অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার জেট ‘জে-টেন সিই’। এই উদ্যোগটি কেবল নতুন বিমান কেনা নয়, বরং বিমান বাহিনীর সামগ্রিক আধুনিকায়নের একটি বড় অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩-৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে মিগ-২১ সংগ্রহের মাধ্যমে। এগুলো ছিল তৎকালীন সময়ের অত্যাধুনিক সুপারসনিক যুদ্ধবিমান। এমনকি ভারতও আমাদের কয়েক বছর পর মিগ-২১ সংগ্রহ করেছিল। এরপর ১৯৭৭ সালে চীন থেকে এফ-৬ (চীনে জে-সিক্স নামে পরিচিত) যুদ্ধবিমান কেনা হয়। আশির দশকে বহরে যুক্ত হয় এফ-৭ মডেলের বিমান। ১৯৯৯ সালে রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ কেনার মাধ্যমে বিমান বাহিনীতে বড় ধরনের আধুনিকায়ন ঘটেছিল, যা ছিল সেসময়ের বিশ্বমানের প্রযুক্তি।
সামরিক তথ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশ’-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহরে প্রায় ২১২টি বিমান রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি রয়েছে রাশিয়ার তৈরি ১৪টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান, যা হালকা আক্রমণ চালানোর উপযোগী। এছাড়া চীনের এফটি-সেভেন প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড সিরিজের কৌশলগত পরিবহন বিমানও বহরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে রাশিয়ার এমআই সিরিজের ৩৬টিসহ মোট ৭৩টি হেলিকপ্টার এবং ৪৪টি ড্রোন রয়েছে, যার মধ্যে তুরস্কের বায়রাক্তার টিবি-টু এবং স্লোভেনিয়ার ব্রামর সি ফোর আই উল্লেখযোগ্য।
নতুন করে জে-টেন সিই যুদ্ধবিমান সংগ্রহের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি মাল্টিরোল ফাইটার জেট, যা আকাশ প্রতিরক্ষা, আকাশ থেকে আকাশ ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণ, ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট এবং মেরিটাইম অপারেশনে সমান দক্ষ। সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার জানান, এটি একটি ‘ফুল প্যাকেজ’ হিসেবে আসছে, যেখানে ইনবিল্ড জ্যামার, রাডার এবং সার্ভেইল্যান্স ক্যাপাসিটি যুক্ত থাকবে।
চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, সাশ্রয়ী মূল্য। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করেছেন, ইউরোপ বা আমেরিকার সমমানের যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনের বিমানের খরচ অনেক কম, যা অর্ধেকেরও কম বা এক-তৃতীয়াংশ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত সুবিধা। ভারত ও মিয়ানমার রাশিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করায়, ভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। তৃতীয়ত, চীন কোনো রাজনৈতিক বা শর্তযুক্ত বাধা ছাড়াই সরঞ্জাম সরবরাহ করে, যা আমেরিকার মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।
তবে যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে যুদ্ধবিমান সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হার্ড এয়ারক্রাফট শেল্টার বা কংক্রিটের সুরক্ষিত অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। বর্তমানে ১৩টি এয়ারফিল্ড ব্যবহারের উপযোগী থাকলেও সবগুলোকে সবসময় অপারেশনাল রাখা চ্যালেঞ্জিং। এছাড়া তেজগাঁও বিমানবন্দরের মতো রানওয়েগুলো বেসামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ‘গ্রাউন্ড বেইজড রাডার নেটওয়ার্ক’ চালু করেছে, যা শত্রু বিমানের আগাম সতর্কতা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করবে। চীনের সাথে করা চুক্তির আওতায় নতুন যুদ্ধবিমানের সাথে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ড্রোন প্রযুক্তি যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭৭ সালে চীন থেকে কেনা এফ-৬ যুদ্ধবিমানটি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে আলোচনায় এসেছিল। পাকিস্তান দাবি করেছিল, এই বিমান দিয়েই তারা ভারতের অত্যাধুনিক রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল। যদিও বাংলাদেশের বর্তমান মিগ-২৯ বিমানগুলো কিছুটা আধুনিক, তবুও আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেগুলো পুরনো প্রযুক্তির। তাই নতুন জে-টেন সিই যুদ্ধবিমান সংযোজন বিমান বাহিনীর সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান—সব ক্ষেত্রেই চীনের সামরিক সরঞ্জামের বড় উপস্থিতি রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা এবং প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সাথে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতাকে বহুমাত্রিক করে তুলছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীন থেকে বাংলাদেশ প্রথম যে যুদ্ধবিমান কিনেছিল এর আনুষ্ঠানিক নাম এফ-৬। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঢাকার বিজয় সরনি থেকে জিয়া উদ্যানের দিকে গেলে রাস্তার মোড়ে মাঝারি আকারের যে যুদ্ধবিমান চোখে পড়বে, সেটি এ ধরনের বিমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিমানটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর একে উন্মুক্ত প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও চীনের জে-টেন বিমান নিয়ে খবর-বিশ্লেষণ উঠে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের পরিকল্পনায় শুধু কি যুদ্ধবিমানই যথেষ্ট।




















