বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত তিন বছর ধরে এই হার আর বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাক্ষরতার হার মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই স্থবিরতার ফলে দেশের প্রায় ২১ দশমিক ৯ শতাংশ বা প্রায় চার কোটি মানুষ এখনো সাক্ষরতার আলো থেকে বঞ্চিত। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোর, প্রান্তিক মানুষ এবং শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়া প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষদের নিয়ে গঠিত।
৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৬৭ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এবং ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার পাশাপাশি নিরক্ষরতা দূরীকরণের অঙ্গীকার রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সব পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষ ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতা ও হিসাব-নিকাশে দক্ষতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
নিরক্ষরতা দূরীকরণে সরকারি সংস্থা ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’ কাজ করে যাচ্ছে। তাদের তথ্যমতে, দেশের ৬৪ জেলার ২৪৮টি উপজেলায় ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে ৪৪ লাখ মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তবে দেশে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো শিক্ষা আইন নেই। বর্তমানে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪ এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০-এর অধীনে শিক্ষার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সাক্ষরতার হার বাড়াতে উন্নত দেশগুলো অনেক এগিয়ে। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে বা লুক্সেমবার্গের মতো দেশগুলো শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের সুফল ভোগ করছে। অন্যদিকে, মালি বা সোমালিয়ার মতো দেশগুলো সাক্ষরতার হার কম হওয়ায় দারিদ্র্য ও সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক। এই অঞ্চলে মালদ্বীপ ৯৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ সাক্ষরতা নিয়ে প্রথম এবং ৯২ দশমিক ৩৮ শতাংশ নিয়ে শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। ৭৮ শতাংশ সাক্ষরতার হার নিয়ে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে আছে। এছাড়া ভারতের সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৫৮ শতাংশ। অন্যান্য বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের সামগ্রিক সাক্ষরতার হার ৮০ দশমিক ৯ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৯৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে ৯৯ শতাংশ।
ব্যক্তি ও সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতির মূল ভিত্তি হলো সাক্ষরতা। একটি আলোকিত ও সক্ষম সমাজ গঠনে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রযুক্তিভিত্তিক সাক্ষরতার কোনো বিকল্প নেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও, একটি শতভাগ সাক্ষর সমাজ গড়তে বাংলাদেশকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। জ্ঞানের আলোয় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং আগামী প্রজন্মের মেধা ও মননশীল বিকাশের জন্য সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিপরীতে এখনো ২২ শতাংশের বেশি মানুষ নিরক্ষর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশেও সামগ্রিক সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এখনও প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষের সাক্ষরজ্ঞান নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ তাঁরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার বাইরে রয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, দেশে সাক্ষরতার হার ক্রমান্বয়ে বাড়লেও এখনও মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ এখনো নিরক্ষরতার অন্ধকারে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই লক্ষ্য অর্জনেও বাংলাদেশ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থনীতি ও জনসংখ্যায় বৃহৎ দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য নানামুখী কর্মসূচি নিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারতের সাক্ষরতার হার ৮০.৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৯৩ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৯৭.৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৯৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯৮.৮,তাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৯৯ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৯৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশে সামগ্রিক সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ।




















