গত জুলাই মাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ পথচলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ঐতিহাসিক ‘লংমার্চ’, যার বয়স এখন ৯০ বছর। বর্তমান চীনা নেতা সি চিন পিং দলের এই দীর্ঘ অগ্রযাত্রাকে ‘মহাকাব্যিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১৯৩৪ সালে প্রতিপক্ষের ঘেরাও থেকে বাঁচতে সিপিসির কৃষক-ক্যাডাররা রুইজিন থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রায় এক লাখ মানুষের সেই দুই বছরের কঠিন যাত্রার শেষে ১৯৩৬ সালে মাত্র ১০ হাজার ক্যাডার টিকে ছিলেন। এই লংমার্চের শেষ জীবিত সাক্ষী ওয়াং গুইজিয়াং ১০৪ বছর বয়সে গত ২২ জুলাই মারা গেছেন, যার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের একটি শারীরিক যোগসূত্র শেষ হলো।
১৯২১ সালে মাত্র ১৩ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সিপিসি ১৯৪৯ সালে ক্ষমতা দখল করে। সেই সময়ের কৃষিনির্ভর অনুন্নত চীন আজ ৭৭ বছর পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। মাও সে-তুংয়ের হাত ধরে বিপ্লবের সূচনা হলেও, দেং জিয়াও পিংয়ের হাত ধরে দেশটিতে জাদুকরি অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। সিপিসির বর্তমান নেতা সি চিন পিং সেই প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী রূপ দিয়েছেন। মাওয়ের আমল নিয়ে দেং জিয়াও পিংয়ের মূল্যায়ন ছিল, ‘৭০ ভাগ ভালো, ৩০ ভাগ খারাপ’। অর্থাৎ, মাওয়ের মেধাকেই তিনি মুখ্য হিসেবে দেখেছিলেন।
লংমার্চের সময় ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর মাও সে-তুং বলেছিলেন, এটি একটি বীজ বপনকারী যন্ত্রের মতো, যা থেকে ভবিষ্যতে ফসল পাওয়া যাবে। ৯০ বছর পর চীনের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থান সেই কথারই প্রতিফলন। বর্তমানে দলটির সদস্য সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। দারিদ্র্য বিমোচন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীন যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা মূলত সেই লংমার্চের ধারাবাহিকতা। জাতিসংঘ নির্ধারিত সময়ের এক দশক আগেই চীন চরম দারিদ্র্য দূর করতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের চরম দারিদ্র্য হ্রাসে চীনের অবদান ৬০ শতাংশ।
চীনের এই উন্নয়ন মডেলের একটি বড় দিক হলো নীতিগত ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে নতুন সরকার এলে অনেক সময় পূর্ববর্তী নীতিগুলো পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়, কিন্তু সিপিসি আগের নীতিকে সংস্কার করে এগিয়ে নিয়ে যায়। ফুজিয়ান, জেচিয়াং ও সাংহাইয়ের মতো প্রদেশগুলোতে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পরই নেতারা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উঠে আসেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংও একইভাবে ধাপে ধাপে দক্ষতা প্রমাণ করে এই অবস্থানে এসেছেন।
তবে এই উন্নয়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইন-ইক্যুয়ালিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, চীনে আয় ও সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে সি চিন পিং এখন বড় কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য কমাতে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং ‘যৌথ সমৃদ্ধি’র ওপর জোর দিচ্ছেন। দেং জিয়াও পিংয়ের ‘নিজেকে সমৃদ্ধ করো’ নীতির বিপরীতে সি এখন সমাজকল্যাণমূলক বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিষয়েও নানা জল্পনা রয়েছে। পলিটব্যুরোর স্ট্যান্ডিং কমিটিতে থাকা কাই চিকে সির ঘনিষ্ঠ মনে করা হয়, যদিও বয়সের কারণে লি কিয়াংয়ের তুলনায় তিনি কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারেন। তবে সি চিন পিং চাইলে যেকোনো নিয়ম বা বয়সসীমা শিথিল করার ক্ষমতা রাখেন। ২০৪৯ সালে বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তিতে চীন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে চায়। আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য দলের ২১তম কংগ্রেসে এই লক্ষ্য অর্জনের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীন বর্তমানে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত অবকাঠামো খাতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং বিগ ডেটার মতো আধুনিক প্রযুক্তিতেও তারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সিপিসির এই সংঘবদ্ধতা ও লক্ষ্যভেদী মানসিকতা প্রমাণ করে যে, দলটি এখনো যেকোনো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাস্তবে সিপিসি এখনো লংমার্চেই আছে; যা কেবল চীন নয়, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বিশ্বকেও বদলে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্বজুড়ে একটি চেনা প্রশ্ন হলো দেং ও সিদের জাদুটা কোথায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনা ভাষ্যকারদের মতে, সেটি খুঁজতে হলে মাওদের লংমার্চের মনোবিদ্যাকে বুঝতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ৯০তম বার্ষিকীতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর উন্নয়নশাস্ত্রেও বড় এক পাঠ্য হতে পারে সেটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঘটনার শুরু চীনের দক্ষিণ-পূর্বের রুইজিনে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পথে পথে ছিল বিরূপ প্রকৃতির ছোবল আর নিষ্ঠুর প্রতিপক্ষের হামলা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লংমার্চ নিজেই রাজনৈতিকভাবে একটি অনন্য অভিজ্ঞতা হলেও সিপিসি একে ভিন্ন উচ্চতায় নেয় মূল ঘটনার পর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওই অভিজ্ঞতাকে চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা এবং জাতীয় মানসিকতায় পরিণত করে তারা।



















