এমন আশ্চর্য রাত (পর্ব ৩) - Mati News
Friday, November 6

এমন আশ্চর্য রাত (পর্ব ৩)

ধ্রুব নীলের ধারাবাহিক উপন্যাস এমন আশ্চর্য রাত এর তৃতীয় পর্ব

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

জহিরের বাড়ির আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লেবু মিয়া, শিবশঙ্কর আর হাইস্কুলের অর্জুন মাস্টারের বাড়ি। একসময় পুরোটা হিন্দুপাড়া ছিল। জহিরের শৈশব কেটেছে এদের সঙ্গে পূজা-পার্বণের উৎসবে। তবে অনেক বাড়ি বেদখল হয়ে গেছে। যারা আছে তারাও কেমন প্রচ্ছন্ন বিষণ্নতা নিয়ে থাকে।
সপ্তাহ না যেতেই লিপির ঘটনা চলে গেল মতিন চেয়ারম্যান ও তার সাঙ্গপাঙ্গর কানে। মতিনকে নিয়ে বিশেষ ভয় নেই জহিরের। এখন নাকি শমসের নামের এক পাগল কিসিমের ভাতিজা ছড়ি ঘোরাচ্ছে।
পাগলের বয়স বিশের ঘরে। দলবল মিলে চাঁদা তোলে আর একে ওকে ধরে এনে মেরে ফেলে। তার ধারণা সে সামনে চেয়ারম্যান হবে। জানান দিয়ে বেড়াচ্ছে এই ইউনিয়নের গ্রামগুলো সব জলে ভাসা নৌকা। হাল না ধরলে অচেনা ঘাটে গিয়ে ভিড়বে।
মোটরসাইকেলে ভটভট শব্দ করার একটা বাড়তি যন্ত্র আছে। গগনবিদারী শব্দ করে শমসের গ্রুপের দুটো ছেলে এসে দাঁড়াল জহিরের বাড়ির সামনে। জহির বাইরেই ছিল। তাকে বলল, ‘লিপি আপার কিছু হইলে আমরা ঢাকায় গিয়া কামালের হাড্ডি ভাইঙা থুইয়া আসব।’
বলার স্টাইল দেখে মনে হবে লিপি তাদের কোলেপিঠে মানুষ করেছে। এখন আদরের মূল্য দিতে চায়।
‘তোমরা কেন হাড্ডি ভাঙতে যাবা? কামাল তোমাদের কী করসে?’
‘গেরামের মাইয়ার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি তো মানা যায় না চাচা। কামাল মিয়া আমগো অ্যান্টিপার্টির নেতার আত্মীয়। আমরা দিল নরম মানুষ। পক্ষীর মাংসের মতোন কলিজা। ও লিপি আপা হুনতাসো?’ একটা ছোকড়া গলা উঁচিয়ে লিপিকে শোনাতে চাইল কথাটা।
জহির ভাবলেন ওদের বলবেন, কেউ তার মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেনি। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা সহজ না।
চুলে নীল রং করা কঞ্চির মতো ছেলেটা বলল, ‘চাচা আমরা যামুগা। বিশটা টেকা দেন। সিগারেট খামু।’
ফট করে বেরিয়ে এলো লিপি। মায়ের পুরনো একটা শাড়ি বের করে পরেছে আলমারি থেকে। জহির উদ্দিনের মনে হলো সালেহা বেগম বের হয়েছে, আর চিন্তা নাই।
নীল চুলো ছেলেটার গালে চড় কষালো লিপি। জহিরের মনে হচ্ছে তিনি দৃশ্যটা ফোনের পর্দায় দেখছেন। ইদানিং আজগুবি সব ছোট ছোট ভিডিও দেখা যায় ফোনে। ওরকমই একটা কিছু।
চড়ের ভরবেগ ভালোই ছিল। ছেলেটা আরেকটু হলে পড়ে যেত। তবে তেড়ে এলো না। হচকচিয়ে গেছে। এরা কিলঘুষি খেয়ে অভ্যস্থ। যে কারণে হালকা চড় সহজে হজম হচ্ছে না।
‘আরেকটা দিব? না হলে গায়ে গরম ডাল পড়বে?’
জহির ভাবলেন, বিশ টাকা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া যাক। টাকা ছাড়া যাওয়া মানে পরাজয় স্বীকার করা। পরাজয়ে ডরে না বীর। এরা বীর না। গ্রামের গুন্ডা-পান্ডা। এরা পরাজয়কে ডরায়। একবার ভয় পেয়ে গেলে পার্টিতে জায়গা হবে না।
নীলচুলোর সঙ্গী মোটরসাইকেল স্টার্ট দিল। নিজেকে একটা বিরাট ঘটনার সাক্ষী ভেবে প্রতিবাদে গেল না। নীলচুলোও গজগজ করতে করতে উঠে বসল পেছনে।

চড়ের বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা গেল সন্ধা পেরোতেই। একটার জায়গায় তিনটা মোটরসাইকেল এসে মহড়া দিয়ে গেল মন্দিরপাড়ার সামনে। সবকটা কিশোর বয়সী। এদের কারও লাইসেন্স থাকার কথা না। কীভাবে যেন দামি মোটরসাইকেলের মালিক হয়ে গেছে।
রাতের খাবার খেয়ে দোকানে যাচ্ছিল নুরুল আলম। পথে তাকে ধাক্কা দিয়ে সাইকেল থেকে ফেলে দিল মোটরসাইকেল বাহিনীর একজন। প্রতিবাদ করল না নুরুল। সাইকেলটা তুলে চেইন লাগিয়ে নিল।
নুরুল জানে সে মহা চালাক। এখন তর্ক করা মানেই বেদম মার খেতে হবে। শোধ তুলতে হবে মওকা বুঝে। সিঁধেল চোরের মতো ওদের দলে ঢুকে পড়তে হবে সুরুৎ করে। চেনাজানা অনেকেই এভাবে পার্টিতে ঢুকেছে। নুরুলকে গোনার টাইম কারও হবে না। দলে ঢুকে প্রত্যেককে নপুংশক করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে ফেলল নুরুল।

রাত আটটা। হারুর পাত্তা নেই। ইরফানকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছে দুপুরের পর। সে আবার মোবাইল ফোনও ব্যবহার করে না। অবশ্য কথা বলারও কেউ নেই। মোটরসাইকেল বাহিনীর চেয়ে লিপির এখন দুশ্চিন্তা ছেলেকে নিয়ে।
‘চিন্তা করিস না। হারু সঙ্গে আছে। সে ঘুইরা বেড়ায়। মাছ ধরতে গেছে মনে হয়।’
লিপির বুকে টেনশনের পাথর আরেকটা বাড়ল। মাছ ধরতে গিয়ে আবার যদি নদীতে পড়ে যায়!
জহির মেয়েকে আশ্বস্ত করতে গিয়েও পারলেন না। তার নিজেরও টেনশন হচ্ছে। গায়ে চাদর না জড়িয়েই বেরিয়ে পড়লেন নাতির খোঁজে। কুয়াশায় ভেদ করে আসা ভরা জ্যোস্না এখন বাসি দুধের মতো লাগছে। চাঁদের আলোয় টক টক গন্ধও পেলেন।

দুপুরের পর পর পালপাড়া ছাড়িয়ে মালিনিপুরে চলে গিয়েছিল হারু। বাচ্চারা সাধারণত প্রশ্ন করতেই থাকে। ইরফান চুপচাপ। হারুই বক বক করে এটা ওটা শেখানোর চেষ্টা করছে।
‘ওইটা দেখতাসো? ওইটা হইল বকপাখি। বাটা জিরা আর আস্তা মশল্লা দিয়া কষাইয়া রানলে এক গামলা ভাত খাইতে পারব। এরফান মিয়া বক খাইবা?’
‘বক মুরগি খাব।’
‘ঠিক। বক যা মুরগিও তা। ওইটা হইল আড়ত। সামনের বছর এই খানে আমি ঘর নিমু। ঘর মানে মাছের ঘর। সক্কালে মাছ আইব। বেইল থাকতেই খালি। রাইত তিনটার পরে মজমা বসবো। তোমারেও নিয়া আসবো। গেরামের মজমা দেখবা।’
‘ললিপপ খাব।’
‘চলো দোকানে যাই। তুমি খাইবা, আমিও খামু। ললিপপ খাইতে খাইতে গাঙ্গে যামু। গাঙ্গে মাছ ধরমু।’
‘আমি মাছ ধরব না। মাছ কামড় দেবে।’
‘আরে বোকা, মাছ কেন কামড়াইব। মাছেরে কামড় দিব মানুষ। আমি একটা আস্তা রুই কামড়াইয়া ধইরা ফেলসি। এই এমনে।’
খিল খিল করে উঠল ইরফান। হারুর মনে হলো মারুফার সঙ্গে বিয়ে হলে তারও এমন একটা খিলখিলানি ছেলে হতো। মারুফার কথা মনে পড়লে পেটে গ্যাসের মতো বিচিত্র এক অনুভূতি হয় তার। অতীতের প্রেম আর বর্তমানের ঘৃণা মিলে পেটের ভেতর বুদবুদ তৈরি হয়।
ললিপপ কেনার সময় ইরফানকে আড়চোখে দেখল দোকানি। হারু এ এলাকায় অচেনা। দোকানদার ইরফানকে বলল, ‘অয় তোমার কী লাগে? বাপ?’
ইরফান বলল, ‘না। আমার বাবা না।’
‘তাইলে কী হয়?’
‘জানি না।’
‘উনার নাম জানো?’
‘জানি না। আমার নাম ইরফান।’
হারু বুঝতে পারছে না বিপদের গোখরা সাপ তার ঘাড়ের কাছে ফোঁস ফোঁস করতে শুরু করেছে। ইরফানকে বলল, ‘মামু তুমি লজেন্স খাইবা?’
‘না আমি লজেন্স খাই না। চকলেট খাই।’
‘আইচ্ছা থাউক।’
পকেট থেকে টাকা বের করার আগেই ইশারা দিল দোকানি। হারুকে ধরে ফেলল কয়েকজন।
‘ভাই ছাড়েন তো! ছাড়েন না ক্যান। কী তামশা! কই নিয়া যান!’
‘তামশা তোর পাছা দিয়া বাইর করব হারামি। কার পোলা বেচতে আনসস ক?’
‘আমি কার পোলা আনবো। ও তো আমগো এরফান।’
‘এই বাবু, এই লোক তোমার কী হয়?’
ইরফান ললিপপ চুষতে চুষতে বলল, ‘জানি না।’
‘তোমার মা কই?’
‘জানি না। ওই যে, ওইখানে।’
একজন বলল, ‘এই পোলারে তো আগে দেখি নাই। গেরামের হইলে চিনতাম।’
ভিড়ের মধ্যে থাকা চিকনচাকন লোকটা তেড়ে এসে বলল, ‘মার শালারে!’
হারু কিছু বলার আগেই কে যেন মাথায় চ্যালাকাঠ দিয়ে বাড়ি বসাল। জ্ঞান হারায়নি। তবে দুলে উঠল টিঙটিঙে শরীরটা। মুখ দিয়ে শব্দ বের হলো না।
ইরফানকে ধরে রাখার শক্তিও পাচ্ছে না। দুয়েকবার জহিরের নামটা মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়ল না। দম নিয়ে দিল ছুট। বাজার ছাড়িয়ে বেশিদূর যেতে পারল না। ধরা পড়ল হারু। এই দফায় আর রক্ষা পেল না। বেধড়ক মারে জ্ঞান হারাল।

‘পুলিশে দিয়া লাভ কী। দুদিন না যাইতে জামিন। চোখ দুইটা আগে তুইলা ফেলান।’
‘হাত-পাও তো থাকব। চোখ তুললে আরও লাভ। ভিক্ষা পাইব বেশি। ভিক্ষা কইরা লাখপতি হইব।’
‘কথা সত্য। তারে মাইরা ফালান। মামলা ডিসমিস।’
তৎক্ষণাত স্লোগান উঠে গেল, ‘এক দফা এক দাবি। মাইরা ফালাও মাইরা ফালাও।’
মার খেয়ে হারুর চোখ ফুলে গেছে। ইরফান ঘুরছে এর কোলে ওর কোলে। তাকে কে যেন ফিডারে করে দুধ খাওয়াচ্ছে। ফিডারে খাওয়াটা ঠিক পছন্দ করছে না সে।
‘আংকেলের কাছে যাব। আংকেল বাড়ি চলো।’
একজন ধমক দিয়ে উঠল, ‘চুপ থাক পোলা! তোর আংকেল পোলাধরা। তোরে বেইচা দিব, বুঝছস! বেচলে কত পাইব কে জানি। ওই মিয়া কততে বেচতে নিছিলা? এক লাখ না দুই লাখ?’
‘মনে নাই। আমারে একটু পানি দেন। মাইরাই তো ফেলবেন। মরার আগে একটু পানি দেন।’
জনতার ভিড় পাতলা হলো। ইদানিং মানুষজন সবকিছুতে দ্রুত আগ্রহ হারায়। আশার আলো দেখতে পেল হারু।
জহিরের ফোন নম্বর মুখস্থ নাই। বলেও লাভ হবে না। জহিরকে ওরা ভাববে চোরের সাগরেদ। আর লিপিকে মনে করবে গ্যাংয়ের মহিলা সদস্য। যে জরুরি মুহূর্তে বাচ্চার মা সাজে।
মুরুব্বি গোছের এক টাকমাথাওয়ালা লোক জানতে চাইল, ‘কেমনে মারন যায়, কেউ তো শলাপরামর্শ দিতেসে না।’
‘পুলিশে খবর দিচ্ছি। মারামারির দরকার কী। আইন-আদালত আছে।’
পুলিশের কথা শুনে আগে কোনোদিন এত আনন্দ লাগেনি হারুর।
‘সাত্তার মাস্টর, তুমি অত্যাধিক পণ্ডিত। তোমার পোলারে নিয়া গেছে? নিলে পুলিশে ফোন দিও। দিয়া কইও আমার পোলারে যে ধরসে, তারে আমি ধরসি। ওসি সাব, কাইন্ডলি বলেন, অখন তারে দুধ দিমু, নাকি কলা দিমু। যদি আমার পোলারে নিয়া যাইত, আমি জ্যান্তা কব্বর দিতাম।’
জ্যান্ত পুঁতে ফেললে দৃশ্যটা কেমন হবে ভেবে আগের সেই মুরুব্বি বললেন, ‘ধুর! বেশরিয়তি কথা।’
‘তাইলে পোলাপানরে কই দূর থেইকা ঢিল মারতে।’
‘সে তো ব্যাভিচার করে নাই। করসে? শরিয়তে ছেলেধরার শাস্তি কী? ইমাম সাবরে খবর দিবা নাকি কেউ?’
‘আইন নিজের হাতে..।’
‘আমরা কি বাংলা সিনেমার নায়ক? নায়করা আইন নিজের হাতে তুলে না। আমরা বনপাড়ার লোকজন তুলবো। কারণ আমরা নায়ক তালেব খান না।’
ধমক খেয়ে চুপ সাত্তার মাস্টার। এখন শিক্ষকদেরও কদর নাই। সুযোগ পেলে সবাই ধমকায়।
অতি উৎসাহীদের কয়েকজন হালকা কিলঘুসি দিয়ে যাচ্ছে হারুকে। ঘুসিতে জোর নাই। হারু বুঝল, এরা কোনো দিন মারধর করে নাই। ঘুসির জোর দেখে মনে হলো গালের মশা মারছে।
‘ভাইজান, এইটা ঘুসা নাকি চটকনা? মারতেই তো পারেন না, আপনারে কে কইসে মারতে। ওই ভাইরে কন মারতে। আপনারে দিয়া হবে না।’
হেসে উঠল সবাই। বড় জমায়েতে হাসি সংক্রামক। অল্পতেই কুটি কুটি কয়েকজন তরুণী।
হারুর মাথা কাজ করতে শুরু করেছে। মশকরা চালিয়ে যেতে হবে। মশকরা করা লোককে কেউ দুম করে মেরে ফেলবে না। এর মধ্যে জহিরের কানে খবর যাবে।
ভিড় থেকে নারী কণ্ঠ শোনা গেল, ‘আপনে কি টাঙ্গাইলের ফারুক?’
হারু না শোনার ভান করল।
‘হ ফারুকের মতোই। আমি মারুফার চাচাতো বইনের ননদ। আফনারে একবার মনে হয় দেখসিলাম এলেঙ্গা বাজারে।’
গোঙ্গানির শব্দ করে হারু মাথা তুলে এদিক ওদিক নাড়ল। নিজেকে ফারুক বলে বেঁচে যাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা দিলেও সুযোগটা নিল না। ভাবল, ফারুক হওয়ার চেয়ে হারু সেজে গণপিটুনি খাওয়াই উত্তম।
‘কথা কন না ক্যান?’
‘জে না বইন। আমি ফারুক না, কুষ্টিয়ার কেরামতও না। লোকে আমারে এসব নামে প্রায়ই ভুল করে। একবার তো এক সুন্দরী আপা আমারে ধইরাই কইল, ও মা! আপনে নায়ক মান্নার ছোট ভাই? অবিকল এক চেহারা।’
‘ঠিক, হাঁচা। আফনের চেহারার লগে মিল আছে। আহারে মান্না। কতদিন হইয়া গেছে মরসে।’
হারু নিজেকে বাঁচানোর পথে আরেক ধাপ এগিয়েছে। বুঝতে পারল এটা তার একটা বড় গুণ। গুণটার নাম কী দেবে বুঝতে পারছে না।
রাত আরেকটু বাড়তেই যে যার বাড়ি। ইরফানকে কেউ একজন নিয়ে গেছে। হারু টেনশনে পড়ে গেল। এই সুযোগে আবার সত্যিকারের ছেলেধরা নিয়ে যায়নি তো? তার দাম কয় লাখ টাকা হতে পারে তা নিয়ে কয়েকজন মহিলার মধ্যে ফুসুরফাসুর আলাপ কানে এসেছিল।

‘তো আপনে হইলেন নায়ক শাকিব খান?’
‘আপনারা কারা? আমারে ভেওয়াপাড়ায় নিয়া চলেন। নগদ পাঁচশ দিমু। আমার ওস্তাদের নাম জহির। বিরাট দোকানদার। এলাকার চেয়ারম্যানের চাচাত ভাই লাগে।’
‘আপনের ওস্তাদ মন্ত্রী মিনিস্টার হইলেও লাভ নাই। আপনের ঠিকা পাইসি আমরা।’
‘ঠিকা? কী করবেন?’
‘ঠিকা বুঝেন না! করসফায়ার বোঝেন? আমরা করসফায়ার টিম। ওই সুজইন্না ওর বান্দন খোল। লয়া যাই। শীত লাগতেয়াসে।’
ফোলা চোখ নিয়ে তাকাল হারু। চাঁদের আলোয় দেখল তিনজনকে। একজনের হাতের চাকুতে আলোর প্রতিফলন দেখা গেল। যে হাঁটু মুড়ে বসে কথা বলছে সে ওস্তাদ কিসিমের। আরেকজন সুজন। ফুটফরমায়েশ খাটে। সে হারুর বাঁধন খোলার চেষ্টা করছে। পারছে না।
গ্রামের কেউ একজন বা সবাই মিলেই কি তাদের ভাড়া করে এনেছে? হারুকে মারার জন্য? কত দিয়ে ভাড়া করেছে? কার এত ঠেকা পড়ল ভাড়াটে খুনি আনার।
‘যে গিট্টু লাগাইসে। লতিফ ভাই ছুরিটা দেন।’
‘চাকু দিয়া দড়িটড়ি কাটি না। ধার যাইব।’
‘এত ধার দিয়া কী করবেন, কাটবেন তো মাইনসের গলা। এটা তো কোরবানির গরু না।’
হারুর শরীরে শক্তিটুকুও নাই। ভাবার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল সে নিজেকে বাঁচানো নিয়ে কিছু ভাবতে পারছে না। মাঝে একবার মারুফার কথা মনে পড়লো। মারুফা তাকে উদ্ধার করতে কেন আসবে। সে তো হারুকে দেখতেই পারে না এখন। অথচ সুরুজ মিয়ার দলবল যখন পাকুটিয়ার ক্ষেতে মারুফার আধামরা দেহটাকে ফেলে যায়, ওই দিন সবার আগে ছুটে যায় হারু। বিবস্ত্র মারুফাকে কেউ স্পর্শ করছিল না। হারু নিয়ে যায় হাসপাতালে। থানা-পুলিশ আর উকিলের পেছনে দৌড়াল কিছুদিন। নাকানিচুবানি খেয়ে জমিও বিক্রি করে। কাজের কাজ কিছু হলো না। বিচারে তো হারলোই উল্টো নিজেই আসামি হওয়ার দশা। পরের ঘটনা আরও বিচিত্র। সেই ঘটনার পরই ফারুক থেকে হারু হয়ে ভেওয়াপাড়ায় জুড়ে বসে।
হারু ঝিম মেরে আছে। নেতাগোছের লোকটা তার পেট টিপেটুপে দেখল।
‘কিডনি ঠিক আছে?’
‘চোখ ফুইলা গেছে ওস্তাদ।’
‘তুই একটা বেকুব। ফোলা চোখও লাখ টেকা।’
চাকুওয়ালা লতিফুল বলল ‘শালার কী দিনকাল আইল, আঁড্ডিগুড্ডিও নাকি বিশ হাজার।’
‘খালি হাড্ডির দাম নাই। আগে সিদ্ধ কইরা মাংস আলগা করন লাগবো। হাড্ডি আস্তা থাকলে তারপর টেকা। টেকা সহজ বস্তু না।’
দড়ির গেরো খুলছে সুজন। ‘খেপের টেকা পাওনের পর আমারে ছুটি দিবেন ওস্তাদ। সাগর দেখি নাই। ককশোবাজার যামু।’
‘হুরাসাগর নদী আছে। এক্ষণ গিয়া দেইখা আস! নদী সাগর এক কথা।’
ওস্তাদের ধমকে কাজ হয়নি। সুজন গুন গুন করে বাঁধন খুলতে ব্যস্ত। গরু জবাই করার আগে গলার বাঁধন খুলে পায়ে গেরো দেওয়া হয়। মানুষ মারার আগে সুজনের প্রসেসটাও এমন। পা দুটো বেঁধে ফেললে আর চিন্তা থাকে না।
আচমকা কড়া আলোয় ধাঁধিয়ে গেল সবার চোখ।
‘ওই টর্চ মারে কে! টর্চ মারে কে!’
ওস্তাদ লোকটা পিস্তল বের করতে গিয়েও করে না। শীতে ধাতব বস্তুটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে থাকে। হাত দিতে মন চায় না।

রাত নয়টা-দশটা। বারোটা বাজেও এখন গ্রামগঞ্জে হাউ ভলিউমে গান চলে। শীত বেশি পড়ায় আজ গান-বাজনায় কারও আগ্রহ দেখা গেল না। একটা বাড়িতে ফুল ভলুমে সাজন সিনেমার গান বাজছে। গানের সুরে জহিরের মনও অতীতে পিছলে যাচ্ছে।
জহিরের মনে এতদিন সুপ্ত বাসনা ছিল কোনো এক রাতে হাঁটতে গিয়ে হারিয়ে যাবেন। আজ মনে হয় সেটাই হয়েছে। কার জমির আইল পেরিয়ে কোন খেজুর বাগানে হাঁটছেন ঠাহর হলো না।
‘কই আইসা পড়লা?’
‘সালেহা! আসছো? ভালো ভালো।’
সালেহা বেগম মারা গেছেন বছর বিশেক হলো। মাঝে মাঝে ফিরে আসেন। জহিরের সঙ্গে টুকটাক সাংসারিক কথাবার্তা বলে আবার গায়েব হয়ে যান।
জহির জানেন তার মাথা ঠিক আছে। কারণ তিনি এটাও জানেন, এই সালেহার বসবাস তার মাথার ভেতর। এতে সমস্যা নেই। মাথার ভেতর থাকুক। সব কিছুই থাকে মাথার ভেতর। মাথা আছে বলেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আছে।
‘তুমি এইখানে কী করো? আমার নাতি পইড়া আছে মালিনিপুরে। সেইখানে যাও। লিপিকেও নিয়া যাও। একা গিয়া আবার বিপদ বাড়াইও না। থানায় একটা ফোন দিয়া যাও। থানা-পুলিশরে এত ডরাও কেন?’
‘রাস্তা কোন দিকে বুঝতে পারতেসি না।’
কল্পনার সালেহা বেগম পানের পিক ফেলে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলেন। এর মানে তিনি জহিরের নির্বুদ্ধিতায় চরম বিরক্ত। জহির দ্রুত পা চালালেন। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়।
সালেহা বেগম কেন মালিনিপুর যেতে বললেন সেটার কোনো না কোনো ব্যাখ্যা আছে। জহিরের মগজের কোনো একটা অংশ এতক্ষণ বসে বসে সেই ধাঁধার সমাধান করেছে। সেটাই সালেহা বেগমের মুখ দিয়ে বের হয়েছে।
জহির হাঁটছেন। সালেহা বেগম পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আপাতত তার সঙ্গে আসার দরকার নেই। এমন কুয়াশালাগা পূর্ণিমায় একা হাঁটতে মন্দ লাগছে না।

সুজন আর ওস্তাদ গোছের লোকটা ধরা পড়েছে। টর্চের আলো ফেলেছিল এসআই কালাম। ওস্তাদের দেওয়া তথ্যে মিয়াজি মজুমদারের কোমরেও দড়ি পরানো হয়েছে। সাগরেদ লতিফ পালিয়েছে। যাওয়ার আগে কী করে মনে করে চাকুটা দিয়ে গেছে সুজনের হাতে। দামি চাকুটা সে ফেলে দিতে পারছিল না। পুলিশ দেখে চাকু ছুড়ে ফেলে দেয় সুজন। এসআই কালাম হাসিমুখে বলে, ‘আহা! ফেললি কেন। তোল! পইড়া থাকলে কার না কার ঠ্যাং কাটে আবার।’
ইরফান যে বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিল সেখানে বিলাপ চলছে। পুলিশ তাদেরও ধরেছে। শিশু অপহরণের মামলা দেবে বলে ভয়টয় দেখাচ্ছে।
হারুর শুশ্রুসায় ব্যস্ত লিপি। মৃত্যুপথযাত্রীর একটা ছাপ পড়ে গিয়েছিল তার চেহারায়। তার মুখে পানি তুলে দেওয়া হচ্ছে পরম মমতায়।
পুলিশ আপাতত তাকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। পরে সাক্ষী টাক্ষির জন্য ডাক পড়তে পারে।
হারু তার থুতনি ঠেকিয়ে রেখেছে বুকের কাছে। দুই পা অক্ষত থাকলেও ভাব ধরেছে তার পা কাজ করছে না। লিপির কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটার লোভ সামলাতে পারেনি। মুখ দিয়ে টুঁ শব্দও বের করছে না। আলগোছে উঠে পড়ল একটা ভ্যানে।
সেই রাতে মালিনিপুরের লোকজন ঘুমাতে গেল মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। সাত্তার মাস্টার ছাড়া বাকি সবার মনেই একটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল, আহারে, যদি মাইরা ফেলতাম!

ধ্রুব নীলের সব বই কিনুন রকমারি থেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *