লুৎফর কবির
বিমানের জানালায় চোখ পড়তেই মনে হলো, যেন মেঘের বুক চিরে এগিয়ে চলেছি এক রূপকথার শহরে। নিচে সবুজ পাহাড়, তার গা বেয়ে নামছে শুভ্র মেঘ। সেই মেঘের চাদর সরতেই দেখা মিলল নির্মল নগরী—প্রশস্ত সড়ক, সারি সারি ফুল, ঝকঝকে পরিবেশ আর নীরবে ছুটে চলা বৈদ্যুতিক গাড়ি। কোথাও নেই ধুলো, নেই হর্ন আর মানুষের তাড়াহুড়ো। এ সবমিলিয়ে মানুষ, প্রকৃতি, আর প্রযুক্তি একই ছন্দে বেঁচে থাকার এক নতুন ভাষা শিখিয়েছে এই শহরকে।
খুনমিংয়ে এসে প্রথম যে অনুভূতিটি জন্ম নেয়, তা হলো—একটি শহরও কতোটা কোমল হতে পারে। চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ইয়ুননান প্রদেশের রাজধানী খুনমিংকে বলা হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার। এটি শুধু মানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর নয়; এখানে সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও আধুনিকতার মিশেল। মিয়ানমার, লাওস এবং ভিয়েতনামের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল ছিল মানুষের যাতায়াত, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম প্রধান পথ। আজও কমেনি সেই গুরুত্ব, তবে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি পরিচয়—টেকসই ও সবুজ নগরজীবন।
প্রায় চার কোটি সত্তর লাখ মানুষ নিয়ে ইয়ুননান। কিন্তু জনসংখ্যার চাপও এই শহরের সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারেনি। প্রশস্ত সড়ক, সুপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।
খুনমিং-এ রিকশা নেই। পুরনো যানবাহনেরও দেখা নেই বললেই চলে। তার বদলে শহরজুড়ে ছুটে চলছে হাজার হাজার ইলেকট্রিক বাইক আর পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি। বাতাসে নেই ধোঁয়ার গন্ধ বরং আছে গাছের সতেজতা। খুনমিং প্রমাণ করেছে যে, উন্নয়ন আর প্রকৃতির মধ্যে যুদ্ধ নয়, বন্ধুত্বও সম্ভব।
এই শহরের আরেকটি নাম চিরবসন্তের শহর। কারণ, বছরের প্রায় প্রতিটি ঋতুতেই এখানে আবহাওয়া থাকে মৃদু, আরামদায়ক। প্রচণ্ড গরম কিংবা কনকনে শীত—কোনোটিই খুনমিংকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রকৃতি এই শহরকে চিরবসন্তের আশীর্বাদ দিয়েই সাজিয়েছে। এখানকার সবচেয়ে সুন্দর যে বিষয়টি তা হলো পথে পথে ফুলের সৌন্দর্য।
এখানে ফুল শুধু বাগানের সৌন্দর্য নয়; ফুল এখানকার অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার বড় একটা অংশ। শহরের মোড়ে, পার্কে, সড়কের বিভাজনকে, এমনকি আবাসিক এলাকায়ও রঙিন ফুলের সমারোহ। প্রায় ১ হাজার ৬০০ প্রজাতির ফুলের চাষ হয় এই অঞ্চলে। ক্যামেলিয়া, লিলির স্নিগ্ধতা, অর্কিডের অভিজাত ফুলের ছড়াছড়ি।
এই সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় জায়গা খুনমিং আন্তর্জাতিক ফুলের বাজার। যেটি কিনা এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের বাজার। এখানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে চলে ফুলের নিলাম। সেই নিলাম থেকেই দরদামে ফুল কেনেন ব্যবসায়ীরা। এখানে অনেক কর্মী আছেন যারা ফুল বাছাই, প্যাকেটজাতকরণ ও রপ্তানির কাজে ব্যস্ত। প্রতিদিন এখান থেকে লাখ লাখ ফুল পাড়ি জমায় চীনের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি দেশের বাইরেও।
খুনমিংয়ে যে পাহাড়ে ফুল ফুটে, সেই পাহাড়েই জন্ম নেয় চীনের সেরা কফির একটি। ইয়ুননানের পাহাড়ি ভূমি, অনুকূল জলবায়ু এবং উর্বর মাটি কফি চাষের জন্য আদর্শ। বর্তমানে চীনে উৎপাদিত অধিকাংশ কফির জন্ম এখানেই। তাই অনেকেই ইয়ুননানকে বলেন—চীনের কফি ক্যাপিটাল।
এখানকার ছোট ছোট ক্যাফেতে বসে স্থানীয় কফির কাপে চুমুক দিলে বোঝা যায়, কেন এই কফি এতোটা জনপ্রিয়। এর স্বাদে পাহাড়ের নির্মলতা, আবহাওয়ার কোমলতা আর মাটির গভীর সুবাস মিশে আছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংও ইয়ুননানের কফির প্রশংসা করেছেন। তার সেই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ইয়ুননানের কফির পরিচিতি আরও বেড়েছে।
তবে খুনমিংয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। চীনে সরকারিভাবে স্বীকৃত ৫৬ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ২৫টির বসবাস ইয়ুননানে। তাই এই অঞ্চলকে চীনের নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভূখণ্ডগুলোর একটি বলা হয়।
এখানে অর্থনীতিতে ফুলের সুবাসে বিকশিত হয়, কফির কাপে পাহাড়ের গল্প মিশে আছে, আর মেঘ প্রতিদিন শহরের মাথায় নেমে এসে মনে করিয়ে দেয়—সৌন্দর্য সব সময় চোখে দেখা যায় না, কখনো কখনো তা অনুভব করতে হয়।
লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, সিএমজি বাংলা।





















