ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার আস্থার সংকট দূর করতে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা কমাতে একটি যৌথ নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ইরাক। রবিবার ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাসিম আল-আরাজি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বাগদাদ ইতোমধ্যে তেহরান ও রিয়াদের কাছে এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছে। তবে প্রস্তাবিত এই পরিষদের সুনির্দিষ্ট কাঠামো, দায়িত্ব বা কার্যপ্রণালি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
ইরাকিয়া টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাসিম আল-আরাজি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান অন্তরায় হলো আস্থার অভাব। এই ঘাটতি পূরণে একটি সরাসরি নিরাপত্তা সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন। যদিও ইরান বা সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, ফলে উদ্যোগটি কতদূর এগোবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরান ও সৌদি আরবের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ প্রভাব ফেলে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই দেশের মিত্রদের ঘিরে নিরাপত্তা ও সামরিক উদ্বেগ নতুন করে দানা বেঁধেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে তারা বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।
বাগদাদের এই নতুন প্রস্তাবের পেছনে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার অভিযোগ একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। গত ২৭ জুলাই সৌদি আরব দাবি করেছিল যে, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে বেশ কয়েকটি ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, যা তাদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ এবং রাজধানী রিয়াদের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের দায়ী করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিল।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ড্রোনগুলো সত্যিই ইরাকি ভূখণ্ড থেকে ছোড়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখাই ছিল এই তদন্তের মূল লক্ষ্য।
নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাসিম আল-আরাজি একই সঙ্গে ইরাকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা ইরাকের নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকার কেবল ইরাকি রাষ্ট্রেরই রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ইরাকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনীতির জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এসব গোষ্ঠীর কিছু অংশ পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফ-এর কাঠামোর ভেতরে থাকলেও অনেকে এর বাইরে সক্রিয়। গত ৩ জুন ইরাকি সেনাবাহিনী অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়, যা এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগেও ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে ইরাক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। এবারের যৌথ নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব সেই প্রচেষ্টাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি ইঙ্গিত। যদি এই প্রস্তাব বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি নতুন পথ তৈরি হবে, যা আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ইরাকের এই উদ্যোগ সামনে এলো।




















