পিএসসি চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগ: নেপথ্যে নানা আলোচনা - Mati News
Thursday, August 20

পিএসসি চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগ: নেপথ্যে নানা আলোচনা

মেয়াদের অর্ধেক পার হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেম। গতকাল দুপুরে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তাকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি পিএসসিতে বহুমুখী সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন, যা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই তার এই পদত্যাগ নিয়ে পিএসসির ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা চলছে। সূত্র জানিয়েছে, তার সংস্কারমূলক কার্যক্রমের কারণে একটি সুবিধাবাদী মহল শুরু থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছিল।

পিএসসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত একটি সিন্ডিকেট মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই সিন্ডিকেটের তৎপরতার কারণে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার এক ধরনের বিরোধের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলেন, যা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চেয়ারম্যানের এই পদত্যাগ সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনমনে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

যদিও পদত্যাগপত্রে ড. মোবাশ্বের মোনেম শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন, তবে পিএসসির কর্মকর্তারা বলছেন তিনি নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। পদত্যাগের পেছনে প্রধানত দুটি কারণের কথা শোনা যাচ্ছে। প্রথমত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়ায় নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তার কাজের সমন্বয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন বার্তা তাকে দেয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত প্রস্তাবনা নিয়ে জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার টানাপড়েন তৈরি হয়। শোনা যাচ্ছে, কোনো একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা তার ওপর রুষ্ট ছিলেন, যা তাকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ ১২ জন সদস্যের পদত্যাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ড. মোবাশ্বের মোনেমকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ ঘোষণা করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ১২ মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। ৫০তম বিসিএস থেকে এই সময়সীমা কার্যকর করার পাশাপাশি ৫১তম বিসিএস থেকে নিয়মিত চক্র বজায় রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বিসিএসের দীর্ঘদিনের জট কমাতে একযোগে ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়, যেখানে ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া ৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে দ্রুত ফল প্রকাশ এবং ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দ্রুত মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়, যা চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

তার সময়ে পিএসসির কার্যক্রমে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। দায়িত্ব নেয়ার পর ৩/৪টি বিসিএস এবং নন-ক্যাডার পরীক্ষাসমূহের জট নিরসন করে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনেন। বিশেষ করে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন এবং পুরো কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করার ফলে তার মেয়াদকালে প্রশ্নফাঁসের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আসেনি। অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পিএসসির নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্ম কমিশন চাকরিপ্রার্থীদের কাছে নতুন করে আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পিএসসির সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, সুবিধাবাদী মহলের প্রতিবন্ধকতায় তার গৃহীত সংস্কার পরিকল্পনাগুলো এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *