সাংস্কৃতিক উপভোগের কেন্দ্র হিসেবে ফিরে আসছে প্রেক্ষাগৃহ - Mati News
Tuesday, September 8

সাংস্কৃতিক উপভোগের কেন্দ্র হিসেবে ফিরে আসছে প্রেক্ষাগৃহ

সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রীয় চলচ্চিত্র প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন যৌথভাবে ‘চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় কার্যক্রম ও সমৃদ্ধ উন্নয়নবিষয়ক বিজ্ঞপ্তি’ জারি করেছে। এতে সিনেমার প্রদর্শন পদ্ধতি, পরিচালন মডেল ও পরিষেবায় নতুনত্ব আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো প্রেক্ষাগৃহকে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের স্থান থেকে দর্শন, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক উপভোগকে একীভূত করে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে রূপান্তর করা।

চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান পরিচালনাগত চাপ ও রূপান্তরের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক উপভোগের মানোন্নয়ন এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভোগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার সঙ্গেও সামঞ্জস্য স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একসময় প্রেক্ষাগৃহ ছিল শহরের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক মিলনস্থল। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহগুলো কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি ধারণ করেছে এবং শহুরে সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তবে স্ট্রিমিং মিডিয়ার দ্রুত বিকাশ এবং দর্শকদের সামাজিক অভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে ‘বক্স অফিস আয় + পপকর্ন বিক্রি’ নির্ভর ঐতিহ্যবাহী সিনেমা ব্যবসার মডেলটি পড়েছে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চীনের মোট বক্স অফিস আয় ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ইউয়ান, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কম। একই সময়ে সিনেমা দর্শকের সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, প্রেক্ষাগৃহের ভাড়া ও যন্ত্রপাতির অবচয় হলো স্থির খরচ। বক্স অফিস আয় কমলেও এসব ব্যয় কমে না। ফলে কিছু প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

‘বক্স অফিস আয় + পপকর্ন বিক্রি’ নির্ভর ঐতিহ্যবাহী একক ব্যবসায়িক মডেলের দুর্বলতা ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।এই পরিস্থিতিতে সিনেমা হলের রূপান্তর ও উন্নয়নের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে জাতীয় নীতিমালা। বিজ্ঞপ্তিতে তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে মোট ১০টি পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্ষেত্রগুলো হলো বহুমুখী ব্যবসার সমন্বয়, ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং পরিষেবার মানোন্নয়ন।

এর লক্ষ্য হলো সিনেমা হলগুলোকে শুধু ‘টিকিট বিক্রি’ থেকে ‘অভিজ্ঞতা বিক্রি’র দিকে নিয়ে যাওয়া এবং সাধারণ চলচ্চিত্র প্রদর্শন কেন্দ্র থেকে শহুরে সংস্কৃতি ও জীবনযাপনভিত্তিক পরিষেবা কেন্দ্রে উন্নীত করা।

প্রথমত, বহুমুখী ব্যবসার সমন্বয়কে উৎসাহিত করাই এই নীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞপ্তিতে সিনেমা হলগুলোকে চলচ্চিত্রের থিমভিত্তিক খাবার তৈরি এবং চলচ্চিত্রের আইপি-ভিত্তিক খাদ্যপণ্য উন্নয়নে উৎসাহিত করা হয়েছে।

পাশাপাশি আধুনিক সাংস্কৃতিক উপভোগের কেন্দ্র গড়ে তুলতে এআই-চালিত বিনোদন ও ভিডিও গেমের মতো নতুন সেবা চালুর কথাও বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনা জোরদার করা সিনেমা হলগুলোর স্বতন্ত্র প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি। বিজ্ঞপ্তিতে সিনেমা হলগুলোকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিচালনার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘এক দোকান, এক নীতি’র পরিচালন মডেল গ্রহণ, চলচ্চিত্রের আইপি পরিচালনা এবং ব্র্যান্ড নির্মাণ জোরদারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে, পরিষেবার মানোন্নয়ন ও প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ হলো সিনেমা হলগুলোর বহুমুখী পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি। বিজ্ঞপ্তিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সরঞ্জাম আধুনিকীকরণ, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং প্রচার ও বিতরণ পরিষেবার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তার কথা বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগ শুধু সিনেমা হলগুলোর মূল প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে না, বহুমুখী পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তাও দেবে। এর ফলে প্রেক্ষাগৃহগুলো এমন এক অপরিহার্য অফলাইন অভিজ্ঞতার স্থানে পরিণত হতে পারে, যেখানে স্ট্রিমিং মিডিয়ার সীমাবদ্ধতাগুলোও অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব।

বর্তমানে সাংস্কৃতিক ভোগের বাজার অভূতপূর্ব উন্নয়নের সুযোগের মুখোমুখি। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোগের মানোন্নয়নের গতিও বাড়ছে। ফলে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যের প্রতি মানুষের চাহিদা আরও জোরালো হচ্ছে এবং সাংস্কৃতিক ভোগ নতুন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

এ থেকে অনুমান করা যায়, ভবিষ্যতের সিনেমা হলগুলো আর কেবল সিনেমা দেখার জায়গা হয়ে থাকবে না; বরং ধীরে ধীরে সিনেমাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবনযাপনের স্থানে পরিণত হবে। এগুলো শুধু পর্দায় আলো-ছায়ার গল্পই উপস্থাপন করবে না, পর্দার বাইরেও মানুষের যোগাযোগ, বিনোদন ও অবসর যাপনের সুযোগ তৈরি করবে। এভাবেই প্রেক্ষাগৃহগুলো আবারও সাংস্কৃতিক উপভোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারে।

লিলি/ফয়সল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *