সিনেমার টিকিট কেটে আত্মসংস্কৃতির জয়গানে সামিল চীনা তরুণরা - Mati News
Monday, September 7

সিনেমার টিকিট কেটে আত্মসংস্কৃতির জয়গানে সামিল চীনা তরুণরা

লি লি, সিএমজি বাংলা

চীনের তরুণরা আগে যে সিনেমাগুলো নিয়ে বেশি আলোচনা করতো, সেগুলোর বড় অংশই ছিল হলিউডের ব্লকবাস্টারের দখলে। এখন বদলে গেছে সেই ধারা। এখন আলোচনা হয় ‘ন্য চা’, ‘ছাং আন’, ‘অল উইশেস কাম ট্রু’, ‘ডেড টু রাইটস’, ‘ডিয়ার ইউ’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল ইস্ট’সহ বিভিন্ন চীনা সিনেমা নিয়ে। টিকিট কেটেই চীনা তরুণরা প্রমাণ দিচ্ছেন, চীনা সংস্কৃতিক প্রতি তাদের আগ্রহ কতটা বেড়েছে।

কেউ কেউ এক সিনেমা দুই-তিনবারও দেখেছেন। কেউ বাবা-মাকে নিয়ে যাচ্ছেন সিনেমা দেখতে। দর্শকদের মন্তব্যেও ফুটে উঠছে গভীর অনুভূতি—‘এ সিনেমার রেশ বড্ড তীব্র’, ‘হাসতে হাসতে কখন যে চুপ হয়ে গেলাম!’

এই প্রজন্মের তরুণরা দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য অর্থ ব্যয় করতে এখন আর ওয়ালেটের দিকে তাকাচ্ছেন না। প্রশ্ন হলো টাকা দিয়ে তারা কি শুধু সিনেমার টিকিটটাই কিনছেন? নাকি সঙ্গে আরও কিছু?

সম্প্রতি ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল ইস্ট’ সিনেমাটির মুক্তির আগে তেমন প্রচারণা ছিল না। মুখে মুখেই সিনেমাটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। অনেক দর্শক কমেডি উপভোগের আশায় সিনেমাটি দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাসির সঙ্গে চোখে জলও এসেছে।

সিনেমাটি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জীবনের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। দেখিয়েছে, কীভাবে চীনা মানুষ নিজেদের টিকে থাকার বুদ্ধি ও জীবনদর্শন কাজে লাগিয়ে একটি অপরিচিত দেশে জীবনের প্রজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান করেছে এবং সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও মানবিকতার মৌলিক মূল্যবোধ ধরে রেখেছে।

এই অপ্রত্যাশিত চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতা দর্শকদের পর্দায় বলা গল্পের মধ্যে নিজেদের খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। আর এটিই হয়তো তরুণদের এসব সিনেমা একাধিকবার দেখার পেছনে অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী করেছে।

একটি চলচ্চিত্র দেখার সময় প্রথম যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো—‘গল্পটি কে বলছে?’ কারণ বর্ণনার দৃষ্টিকোণই অনেকাংশে দর্শকের চিন্তার কাঠামো ঠিক করে।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব চলচ্চিত্রের মূলধারার বর্ণনার যুক্তি ও বিচারব্যবস্থায় হলিউডের বড় প্রভাব গড়ে উঠেছে। সেখানে আমেরিকানদের দেখা যায় বিশ্বকে রক্ষা করতে, ব্রিটিশরা রহস্যের সমাধান করে, আর এশিয়ার গল্পগুলোকে প্রায়ই এক ধরনের ‘বহিরাগত কল্পনা’র মধ্যে উপস্থাপন করা হয়। ফলে এসব গল্পে গতানুগতিক ও প্রতীকী চিত্রায়ন দেখা যায় এবং দর্শকের মনে এক ধরনের দূরত্ব ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল ইস্ট’ বিশ্বকে একটি চীনা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। বাস্তব জীবনের বিদেশি সংঘাতের মধ্যে টিকে থাকতে চীনা মানুষের আচরণবিধি ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের নীতি কীভাবে কাজ করে, তা তুলে ধরার পাশাপাশি এতে দয়া, মানবিকতা এবং ‘ভালোভাবে খাওয়া ভালো জীবনের অংশ’—এমন সরল জীবনদর্শনও ফুটে উঠেছে। বর্ণনার এই নিজস্বতা ফিরে আসাই হয়তো তরুণ দর্শকদের সঙ্গে সিনেমাটির সেতুবন্ধন তৈরির অন্যতম কারণ।

মাঝেমধ্যে ক্যামেরাও একটি ভাষা হয়ে ওঠে। কীভাবে গল্পটা দেখানো হচ্ছে, তা অবচেতনভাবেই একটি প্রজন্মের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে।

নিজেদের গল্প বলার এই ধারা অর্জিত হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৬ সালে যুদ্ধের আগুনের মধ্যেই একদল তরুণ চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে উত্তর-পূর্ব চীনে যাত্রা করেন। সেখানে একটি অস্থায়ী কর্মশালায় অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তারা নর্থইস্ট ফিল্ম স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন, যা কিনা পরে ছাংছুন ফিল্ম স্টুডিওর পূর্বসূরি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে।

সেই সময় সম্পদ ছিল সীমিত, পরিস্থিতি ছিল কঠিন। ওই শুধু ক্যামেরা ও ফিল্ম নয়, চীনা জনগণের গল্প নিজেদের ভাষায় বলার অধিকার রক্ষা করতেও মরিয়া ছিলেন নির্মাতারা।

আজকের তরুণ প্রজন্ম হয়তো সেই ইতিহাস জানে না। কিন্তু চীনা চলচ্চিত্র দেখার জন্য টিকিট কেনার মাধ্যমে তারা সেই একই অঙ্গীকার বহন করে চলেছে—চীনা গল্প চীনাদের নিজেদের মুখেই বলতে হবে।

তরুণ প্রজন্ম কোন ধরনের চলচ্চিত্র দেখতে চায় এখন। বক্স অফিসের তালিকার তাকালে উত্তর মিলবে। যেসব চলচ্চিত্র পর্দায় নিজেদের গল্প দেখার সুযোগ করে দেয়, সেগুলোই।

‘ন্য চা’ সিনেমার ‘আমার ভাগ্য আমার নিজের হাতে, স্বর্গের হাতে নয়’—এই বক্তব্যকে শুধু পাশ্চাত্য ধাঁচের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতি চীনা জনগণের দৃঢ়তা ও লড়াই করার সাহস।

‘অল উইশেস কাম ট্রু’ সিনেমার মূল বিষয়ও শুধু লোককথার দেবতাদের অলৌকিক ক্ষমতা নয়। বরং চিরায়ত কাহিনীগুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ‘লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নই মুখ্য’—এমন নৈতিক শক্তিকে তুলে ধরা হয়েছে।

‘ডিয়ার ইউ’ বিদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের গল্পের মাধ্যমে আনুগত্য ও ন্যায়পরায়ণতার মতো ঐতিহ্যবাহী চীনা মূল্যবোধকে তুলে ধরেছে।

আর প্রবাসী চীনাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্মিত ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল ইস্ট’ সংকটের সময়ে চীনা মানুষের সহনশীলতা, প্রতিকূলতাকে সুযোগে পরিণত করার প্রজ্ঞা, বিপদের মুখে নিঃস্বার্থতা এবং যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিপ্রিয় মানবিক চেতনাকে জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

পৌরাণিক কাহিনি থেকে বাস্তব জীবন—বিভিন্ন পরিসরে বিস্তৃত এসব গল্পে একটি পরিচিত ধারা রয়েছে। তরুণরা শুধু ইন্দ্রিয়গত উত্তেজনা বা তারকাদের প্রতি সমর্থন জানাতে টিকিট কিনছেন না; বরং তারা খুঁজছেন আবেগ ও মূল্যবোধের অনুরণন। পর্দায় নিজেদের খুঁজে পাওয়া এবং চলচ্চিত্রের আখ্যানের মাধ্যমে চীনা চেতনার একটি আত্মপ্রতিকৃতি গড়ে তোলাই তাদের কাছে মুখ্য।

যখন কোনো চলচ্চিত্র তরুণদের মনে এই অনুভূতি জাগায়—‘এটাই আমি’, ‘এটাই আমার সংস্কৃতি’—তখন তারা স্বভাবতই টিকিট কিনে সমর্থন জানান। এটি অন্ধ তারকাপূজা নয়; বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দিকে এক স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তন।

১৯০৫ সালে চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের তৈরি প্রথম চলচ্চিত্র ‘ডিংচুন মাউন্টেন’ বেইজিংয়ের ফেংথাই ফটো স্টুডিওতে মুক্তি পায়। এর মধ্য দিয়ে চীনা চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়।

চলচ্চিত্রের উৎস বিদেশি শিল্পমাধ্যমে হলেও, চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রচেষ্টায় এটি শিল্পসৃষ্টি ও অডিওভিজ্যুয়াল প্রযুক্তিতে একের পর এক সাফল্য অর্জন করেছে। এখন এটি বিভিন্ন ‘ফিল্ম প্লাস’ ফরম্যাটে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

সিএমজি ফিল্ম কালচার কার্নিভাল এর উজ্জ্বল উদাহরণ। চলচ্চিত্র এখন আর শুধু প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাজার, আইপি প্রদর্শনী, ইন্টারেক্টিভ অভিজ্ঞতা, নতুন চলচ্চিত্রের রোডশো এবং উন্মুক্ত স্থানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মতো নানা আয়োজনের মাধ্যমে এই কার্নিভাল সব বয়সী মানুষকে চলচ্চিত্রের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

বসন্তে চেচিয়াং প্রদেশের নিংবো থেকে শুরু করে গ্রীষ্মে হুবেই প্রদেশের উহান এবং এখন থিয়েনচিন শহরের হাই হ্য নদী পর্যন্ত—চলচ্চিত্রের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ‘ফিল্ম প্লাস’কে কেন্দ্র করে সিএমজি ফিল্ম কালচার কার্নিভাল ক্রমাগত বিকশিত ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। এটি নগর পর্যটন এবং সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক ভোগকে উৎসাহিত করছে এবং মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

এসব কার্যক্রমের প্রধান চালিকাশক্তি তরুণ প্রজন্ম। সিনেমার টিকিট কেনা থেকে শুরু করে কার্নিভালে যোগ দেওয়া, চলচ্চিত্র নিয়ে মতামত কিংবা আলোচনায় অংশ নেওয়া—প্রতিটি অংশগ্রহণই চীনা সংস্কৃতির প্রতি তাদের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।

চীনা চলচ্চিত্রের জন্য পাশ্চাত্য নান্দনিকতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে তোষামোদের প্রয়োজন নেই, আবার বিদেশি মডেল কঠোরভাবে অনুকরণেরও দরকার নেই। বরং চীনা সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গভীরভাবে অনুসন্ধান করা, চীনা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকে দেখা এবং চীনা গল্প আরও ভালোভাবে বলা—এটাই হতে পারে এর ভবিষ্যৎ।

যখন পর্দা জ্বলে ওঠে, তরুণরা শুধু একটি গল্প দেখে না; তারা দেখতে পায় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক সত্তা, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। একই সঙ্গে দেখে চীনা চলচ্চিত্রের অবিচল অগ্রযাত্রার অসীম সম্ভাবনা।

সূত্র: সিএমজি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *