ফয়সল আবদুল্লাহ
একসময় যে কাজ করতে মানুষের ঘণ্টা পেরিয়ে যেত, এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেটা করে দিচ্ছে কয়েক সেকেন্ডে। যন্ত্র যদি এভাবে মানুষের কাজ করে দেয়, তাহলে কর্মীর দরকার হবে আর? যদি দশজন কর্মীর কাজ দুজনকে দিয়েই সব কাজ হয়ে যায়, তবে বাকি আটজনের কী হবে? অন্যদিকে, নতুন প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নে দরকার হচ্ছে নতুন কাজ জানা কর্মীর। তাই এআই যেমন একদিকে কিছু কাজের চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন পেশার হাতছানিও আছে। চ্যালেঞ্জটা হলো, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে সাধারণ মানুষকে কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে?
এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশ্বের কাজে লাগতে পারে চীনের অভিজ্ঞতা। দেশটি এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও প্রয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় নানা ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নিচ্ছে। আগের দিনের চাকরি ছিল নির্দিষ্ট পদ কেন্দ্রিক। কেউ হিসাবরক্ষক, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী। একটি পদ মানে দায়িত্বটাও নির্দিষ্ট। কিন্তু এআইয়ের যুগে এক চাকরির ভেতরেই করতে হচ্ছে অনেকগুলো আলাদা কাজ। এর মাঝে কিছু করবে এআই, আর কিছু কাজে দরকার হবে মানুষের বিচারবুদ্ধি। আর এই নতুন চাহিদার একটি বড় প্রভাব পড়তে চলেছে কর্মসংস্থানে।
আর এই প্রভাব বিবেচনায় নিয়েই চীন প্রকাশ করেছে এআই নিয়ে নীতিগত নির্দেশনা। চীনের রাষ্ট্রীয় পরিষদের সাধারণ কার্যালয় থেকে জারি করা এই নির্দেশনায় এআইয়ের অগ্রগতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো, কাজের মান উন্নত করা এবং নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার প্রযুক্তির কারণে যারা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছে, তাদের সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
চীনের ওই নীতিগত নির্দেশনায় ছয়টি ক্ষেত্রে মোট ১৮টি কাজের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এআইয়ের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কর্মীদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানসেবা শক্তিশালী করা, শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্থান ধরে রাখা ও সম্প্রসারণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চীনের নির্দেশনায়। কারণ, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করা গেলে তারা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কাজের সুযোগও তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এআই-সংশ্লিষ্ট নতুন পেশা ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়।
গতবছর চীনে এআই খাতের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫১০ বিলিয়ন ইউয়ানে। দেশটির অভিজ্ঞতায় আরও দেখা যাচ্ছে, এআইয়ের প্রসারে কিছু নতুন ধরনের কাজের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তথ্য সাজানো ও চিহ্নিত করার কাজ, কৃত্রিম পরিবেশে স্থাপত্য নকশা এবং এআই-নির্ভর দৃশ্য ও অ্যানিমেশন তৈরির মতো পেশা।
যেমন, এআইকে কোনো ছবি বা কথার অর্থ বুঝতে শেখানোর জন্য বিপুল পরিমাণ উদাহরণের প্রয়োজন হয়। সেই শেখানোর কাজটা এখনও করছে মানুষ। এই কাজে যুক্ত কর্মীদের ডেটা অ্যানোটেটর বলা হয়। আর এ ধরনের কাজে উচ্চতর প্রযুক্তিগত ডিগ্রিরও প্রয়োজন হয় না।
চায়না ডেইলির প্রতিবেদনে হ্যনান প্রদেশের এক গৃহিণীর উদাহরণ এসেছে, যিনি বাড়ির কাজের পাশাপাশি এআই-কে তথ্য চেনানোর কাজ করে আয় করছেন।
এসব কাজের কাঠামোটাও যে বদলে যাচ্ছে, সেটার উদাহরণ পাওয়া যাবে চীনের নেটইজ ইউ নেক্সাস প্ল্যাটফর্মে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্যসংক্রান্ত কাজ নেয়। এরপর সেসব কাজকে ছোট ছোট প্রকল্পে ভাগ করে তাদের ব্যবহারকারীদের মাঝে বিতরণ করে। ব্যবহারকারীরা এসব প্রকল্প সম্পন্ন করে পয়েন্ট অর্জন করেন। আর পয়েন্টগুলোই পরে পারিশ্রমিকে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠার তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, এআইয়ের সঙ্গে শিল্পকলা, নকশা ও বাস্তব শিল্পের জ্ঞান যুক্ত করে নতুন পেশার সুযোগ তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে চীনে। ভার্চ্যুয়াল চরিত্রের অবয়ব বানাতে যেমন প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন, তেমনি শিল্পবোধ থাকাও জরুরি। অ্যানিমেশন তৈরিতে এআই দ্রুত প্রাথমিক কিছু কাজ সম্পন্ন করতে পারে, কিন্তু একজন দক্ষ শিল্পী সেই ফলাফলকে নিখুঁত ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন। এমনকি আজকাল কম্পিউটার গেমসের চরিত্রটাকে গ্রাহকের পছন্দমতো ডিজাইন করে দিয়েও আয় করছেন অনেকে।
এবার আসা যাক এআই ও প্রচলিত বিষয়ের সমন্বিত শিক্ষার প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে চীনের শায়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দেওয়া যায়। কম্পিউটারবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির মূল পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি বড় ভাষা মডেল, এআইয়ের প্রয়োগ এবং বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে সেখানে।
চীনের এসব উদাহরণ থেকে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য প্রথম শিক্ষাটি হলো, এআইকে ভয় পেয়ে দূরে সরে থাকা যাবে না। আবার এআইয়ের কোনো একটি টুলস ব্যবহার করতে শিখেই নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত মনে করা ঠিক হবে না।
এক্ষেত্রে নিজের মূল পেশাগত দক্ষতা শক্ত করতে হবে। হিসাবরক্ষককে হিসাববিজ্ঞানের ভিত্তি জানতে হবে, একজন সাংবাদিককে সংবাদ যাচাই ও সম্পাদনা শিখতে হবে, কৃষিবিদকে কৃষিবিজ্ঞানের খুঁটিনাটি সব জানতে হবে। এআইকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া, তার উত্তর যাচাই করা এবং ভুল শনাক্ত করার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকা চাই এসবের পাশাপাশি।
সামনের দিনের চাকরি বাজারে নিজের জ্ঞানের প্রমাণও রাখতে হবে। জীবনবৃত্তান্তে শুধু এআই জানি লিখলেই হবে না; কাজ দেখাতে পারা দরকার। শিক্ষার্থীরা কোনো বাস্তব সমস্যা সমাধানের প্রকল্প তৈরি করতে পারেন, স্থানীয় কৃষি বা পরিবেশের তথ্য সাজাতে পারেন, কিংবা এআইয়ের সাহায্যে কোনো কাজের মান কীভাবে উন্নত করা যায় তা হাতে-কলমে দেখাতে পারেন।
এআই শেখা মানেই সফটওয়্যার প্রকৌশলী হতে হবে এমন নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষি, পোশাকশিল্প, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন ও নানা সেবার ওপর নির্ভরশীল। চীনের দেখাদেখি এসব ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো নিয়ে কাজ শুরু করতে পারে তরুণদের একাংশ। কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা ও তথ্য বিশ্লেষণ, ব্যবসা ও ডিজিটাল বিপণনের মতো সমন্বিত দক্ষতার চাহিদাও তৈরি হতে পারে এতে।
একজন তরুণকে নতুন দক্ষতা অর্জনের কথা বলা সহজ; কিন্তু তার কাছে যদি মানসম্মত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্র, ইন্টারনেট কিংবা প্রশিক্ষণের খরচ বহনের সামর্থ্য না থাকে, তাহলে সেই পরামর্শ খুব বেশি কাজে আসবে না। তাই চীন যেভাবে নীতি তৈরির কৌশল অবলম্বন করছে, সেভাবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকেও একসঙ্গে এ নিয়ে কাজ করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত, কোন কোন খাতে এআইয়ের ব্যবহারে কাজের ধরন বদলাতে পারে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা। কোথায় কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হবে, কোথায় নতুন দক্ষতার প্রয়োজন দেখা দেবে এবং কোন কর্মীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন—এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চীনের মতো কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। এআই ব্যবহার করে কৃষিপণ্যের বাজার বিশ্লেষণ, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি কিংবা উৎপাদনব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কর্মীদের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাটা আরেকটি বড় নীতিগত উদ্যোগ। এআইয়ের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজের ধরন বদলালে কর্মীদের আগেভাগে জানানো এবং নতুন কাজে স্থানান্তরে সহায়তা করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রযুক্তির সুবিধা যদি শুধু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা বাড়ায়, অথচ কর্মীরা অনিশ্চয়তার বোঝা বহন করেন, তাহলে এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্য বাড়াতে পারে।
আরও একটি প্রশ্ন করা জরুরি—এই প্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাচ্ছেন? উৎপাদনশীলতা বাড়ার ফলে কি নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে? কর্মীরা কি ভালো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন? জীবনযাত্রার উন্নতি হচ্ছে কি? যারা প্রযুক্তির পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা আছে?
চীনের কর্মসংস্থানবান্ধব এআই উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই। প্রযুক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলোকে নীতিগত আলোচনার অংশ করা হচ্ছে।
সুতরাং, এআইয়ের যুগে সবচেয়ে বড় সম্পদ শক্তিশালী কম্পিউটার কিংবা উন্নত সফটওয়্যার নয়; বড় সম্পদ হলো এমন মানুষ, যারা নতুন কিছু শিখতে পারেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারেন এবং নিজের জ্ঞান দিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং












