চীনের গ্রাম প্রশাসন থেকে শিক্ষা : কাগজ কম, কাজ বেশি - Mati News
Saturday, November 7

চীনের গ্রাম প্রশাসন থেকে শিক্ষা : কাগজ কম, কাজ বেশি

ফয়সল আবদুল্লাহ, চীন থেকে

চীন দর্পণে আজ আমরা আলোচনা করবো গ্রামাঞ্চলের সমস্যায় একটি চীনা সমাধান নিয়ে। শান্তশিষ্ট ছায়াঢাকা গ্রামীণ জীবনেও কিন্তু দেখা দেয় অনেক সমস্যা। কোনো কৃষকের জমিতে দেখা গেল সেচের পানি পৌঁছাচ্ছে না, কারও বাড়ির পাশের রাস্তা ভাঙা, কোনো পরিবারে বয়স্ক মানুষের দেখাশোনার প্রয়োজন, আবার কোথাও স্কুলের ছুটিতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব সমস্যা দেখভালের দায়িত্বে চীনে আছে গ্রাম প্রশাসন। কিন্তু প্রশাসনিক কাজের কথা ভাবলে আমাদের অনেকের কল্পনায় ভেসে ওঠে একটি দশাসই অফিস ভবনের ছবি, যে ভবনে ফিটফাট হয়ে কাজ করছেন কর্মকর্তারা। কিন্তু চীনের এ চিত্র এখন অনেকটাই ভিন্ন। চীনের গ্রাম কর্মকর্তাদের জন্য এখন গ্রামটাই হলো অফিস। মাঠ-ঘাটই হলো তাদের ডেস্ক।

চীনের অনেক অঞ্চলে এখন আগের চেয়ে প্রশাসনিক কাজের আনুষ্ঠানিকতা কমিয়ে কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে বেশি সময় দেওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। সেই অনুযায়ী তাদের প্রযুক্তিগত সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। আবার কাজের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দাখিল করা কিংবা আনুষ্ঠানিকতাকে আগের মতো খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। সময়মতো প্রতিবেদন জমা দেওয়া বা কোনো ফরম পূরণের চেয়েও চীনের গ্রাম প্রশাসনের কর্মদক্ষতার মাপকাঠি হলো বাস্তব সমস্যার সমাধান।

চীনের হুনান প্রদেশের গাংচংপিং গ্রামের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। গ্রামটির আশপাশে রয়েছে কয়েকটি জলাশয় এবং একটি ছোট জলাধার। গ্রীষ্মের ছুটিতে শিশুরা যখন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে, তখন এসব জলাশয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে গ্রামের কর্মকর্তারা কয়েক বছর আগে একটি বিশেষ উদ্যোগ নেন।

তারা গ্রামের শিশুদের বয়স, স্কুলের সময়সূচি এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর সোজা চলে যান বাড়ি বাড়ি। পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করেন অভিভাবকদের। যেসব শিশু অন্য জায়গায় থাকে, ছুটিতে গ্রামে ফিরলে তাদের অবস্থান সম্পর্কেও খোঁজ রাখেন ওই কর্মকর্তারা।

গাংচংপিং গ্রামের পার্টি শাখার সম্পাদক তাই লিপিং চায়না ডেইলিকে বলেছেন, উদ্যোগটি চালুর পর থেকে গ্রামে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনাও শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

কিন্তু এই কাজ করতে গেলে কর্মকর্তাদের প্রয়োজন ছিল সময়। আগে গ্রামের তিনজন কর্মকর্তা দিনের বেশিরভাগ সময় অফিসের কাগজপত্র তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতেন। প্রশাসনিক নির্দেশনা, প্রতিবেদন, নানা ধরনের তথ্য জমা দেওয়া এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সামলাতে গিয়ে মানুষের বাড়িতে যাওয়ার সময় হতো না তাদের। এখন সেখানে পালাক্রমে অফিসের দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা অফিসে থাকলে অন্যরা গ্রামে ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, কৃষিজমি দেখতে পারেন এবং স্থানীয় সমস্যার খোঁজ নিতে পারেন।

এই পরিবর্তনের ফলে কর্মকর্তারা গ্রামের আরও নানা বিষয় দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ প্রবীণ সহায়তা কেন্দ্রে খাবার তৈরি ও পরিচ্ছন্নতার অবস্থা দেখছেন, কেউ গ্রামের স্যানিটেশন ব্যবস্থা পরিদর্শন করছেন, আবার কেউ কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে কাজ করছেন। এমনকি গাংচংপিংয়ে কর্মকর্তারা সেখানে সোনালি চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চাষের অগ্রগতি দেখে ফসল সংগ্রহের আগে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজটাও করে দিয়েছেন।

তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে চীনে ২০১৯ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের মার্চ মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নির্দেশে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ কার্যালয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, কর্মকর্তারা যেন অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমিয়ে আসল দায়িত্ব পালনে আরও উদ্যোগী হন এবং মানুষের সমস্যা সমাধানে বেশি সময় দিতে পারেন।

পরে এ উদ্যোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এবং রাষ্ট্রীয় পরিষদের সাধারণ কার্যালয় তৃণমূল পর্যায়ের প্রশাসনিক চাপ কমাতে ২১টি বিধানসংবলিত একটি নিয়মাবলি প্রকাশ করে। এতে অপ্রয়োজনীয় সভা ও নথিপত্র কমানো, পরিদর্শন ও মূল্যায়নের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব স্পষ্ট করা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করার কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, বিভাগীয় প্রতিবেদন বড়জোর চার হাজার অক্ষরের মধ্যে থাকবে, বড় আলোচনা অনুষ্ঠান থাকলে তা দেড় দিনে শেষ করতে হবে। স্থানীয় কোনো ছোট মিটিং থাকলে তা অর্ধদিবসেই সেরে ফেলতে হবে। এ ছাড়া, বক্তব্য যেমনই হোক, তা এক ঘণ্টার বেশি বড় করা যাবে না।

২০২৫ সালের আগস্টে এ বিষয়ে আরও কিছু নিয়ম প্রকাশ করা হয়। এতে সরকারি নথির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, সভা সংক্ষিপ্ত করা এবং সরকারি কাজের জন্য ব্যবহৃত ডিজিটাল অ্যাপের সংখ্যা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষভাবে বলা হয়, কোনো সরকারি অ্যাপ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যাবে না এবং শুধু অ্যাপ ব্যবহার বা নিয়মিত লগইন করার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা উচিত হবে না।

চায়না ডেইলির আরেকটি প্রতিবেদনে ছোংছিংয়ের চিউলোংপো নামের একটি কমিউনিটির উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে আগে একজন কর্মীকে বছরে শতাধিক প্রতিবেদন তৈরি করতে হতো। একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা চালুর পর সেই সংখ্যা কমে ১২টিতে নেমে আসে। হুবেই প্রদেশের সিইয়ি গ্রামেও স্থানীয় পর্যায়ে সেবার কাজের তালিকা ৬৪টি থেকে কমিয়ে ২৪টিতে আনা হয়। একই সঙ্গে যাচাইসংক্রান্ত কাজের সংখ্যা ৪০টি থেকে কমিয়ে ৭টি করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণের দ্বীপ প্রদেশ হাইনানেও চালু হয়েছে আগাগোড়া ডিজিটাল রিপোর্টিং সিস্টেম। এতে একটি তথ্য একবার সিস্টেমে প্রবেশ করালেই বিভিন্ন বিভাগ সেটা দেখতে পারে। সেখানকার গ্রাম ও কাউন্টিগুলোতে এখন জনমিতি জরিপ, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য মাঠ থেকে মোবাইল ফোনে দ্রুত সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। আগে যেখানে ঘণ্টা ব্যয় করে দশটি ফরম পূরণ করা লাগত, সেই কাজ এখন ফোনের ডিজিটাল ফরমে পাঁচ মিনিটেই করা হচ্ছে।

আনহুই প্রদেশের ছুচৌ শহরের লাইআন কাউন্টিতে আগে ডিসেম্বর এলেই ব্যস্ত সময় পার করতেন কৃষি ও গ্রামীণ বিষয়ক ব্যুরোর উপপরিচালক লুও ছুয়ানমিং। এ সময় তাকে ও তার সহকর্মীদের পরিদর্শন, পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত থাকতে হতো।

কিন্তু কাগজপত্র তৈরির কাজ কমে আসায় এখন তিনি কৃষকদের কাছে যাওয়ার এবং তাদের বাস্তব সমস্যার সমাধানে সহায়তা করার বেশি সময় পাচ্ছেন। যেমন, এখন তিনি শীতকালীন গমের পরিচর্যা ও উৎপাদনসংক্রান্ত বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

উদাহরণস্বরূপ, আগে গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের অর্জন সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ—এই তিনটি বিষয়ে আলাদা মূল্যায়ন করা হতো। এখন সেগুলো একীভূত করে একটি মাত্র গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন মূল্যায়নব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কাজের সংখ্যা কমানো নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজের মান বাড়ানো।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে বেসরকারি অনেক উন্নয়ন সংস্থাতো বটেই, সরকারি সংস্থার কর্মীদেরও দেখা যায় নানা ধরনের প্রতিবেদন লেখা, বিশ্লেষণ, মন্তব্য প্রতিবেদন, পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড বানাতে বিপুল কর্মঘণ্টা ব্যয় করছেন। এসবের বেশিরভাগই মূলত ফরমালিজম তথা আনুষ্ঠানিকতাবাদের অংশ। আর চীন এই শব্দটির ঘোর-বিরোধী। শুধু গ্রাম প্রশাসনের মতো একটি-দুটি ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিতে উঠে পড়ে লাগেনি দেশটি। মূলত আনুষ্ঠানিকতার কারণে নষ্ট হওয়া সময়ের বিপরীতে চীন সরকার মেপে দেখছে, ওই একই সময়ে কী পরিমাণ বাস্তব সমস্যার সমাধান করা যেত। এমন পাল্লায় কাজের গুরুত্ব মাপতে গিয়েই দেখা যায় কর্মকর্তাদের যত বেশি কাগজপত্রের কাজের বোঝা থেকে মুক্তি দেওয়া যাবে, মাঠ পর্যায়ের উন্নয়নটাও হবে তত বেশি।

এখন যদি কেউ ভেবে থাকে, কাগজপত্র কমে গেলে কর্মকর্তার কাজের মূল্যায়ন হবে কী করে, তাদের জন্য চীনের দর্পণে উত্তরটা হলো—মাঠের উন্নয়নই কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *